বিয়ে রেজিস্ট্রি না করা একটি মারাত্মক ভুল। এই ভুলটি আমাদের সমাজের বহু দম্পতির ক্ষেত্রে ঘটছে এবং ঘটেই চলছে! তারা মনে করেন, হুজুর বিয়ে পড়ালেই যেন সব দায়িত্ব শেষ। কিন্তু এই ‘ছোট্ট ভুল’-এর কারণে স্ত্রী কী কী অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে এবং স্বামীকেই বা কী ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে? চলুন, এই বিষয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলছে, তা স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: রেজিস্ট্রি না করার পরিণতি, অধিকার ও শাস্তি
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন ১৯৭৪- অনুযায়ী, মুসলিম বিবাহ অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে। রেজিস্ট্রি না করা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এটি স্ত্রীর অধিকারকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও শাস্তি-
আইনের রেফারেন্স: মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, বিবাহ রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
শাস্তি: এই আইন অনুযায়ী, বিবাহ রেজিস্ট্রি করা স্বামীর দায়িত্ব। রেজিস্ট্রি না করার অপরাধে স্বামীর দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
স্ত্রী যে অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন-
দেনমোহর ও ভরণপোষণ: কাবিননামা না থাকলে দেনমোহরের পরিমাণ এবং তা পরিশোধের প্রমাণ নিশ্চিত করা স্ত্রীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বামীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করার আইনি প্রক্রিয়াও কঠিন হয়ে যায়।
তালাকের অধিকার: স্ত্রী যদি তালাকের মাধ্যমে বিচ্ছেদ চান, তবে তালাকের নোটিশ জারি বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা কঠিন হয়। কেননা, কাবিননামা বা নিকাহনামা বিয়ের একমাত্র লিখিত প্রামাণ্য দলিল। যা না থাকলে, যে কোন অধিকার প্রতিষ্টা করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে যায়।
সন্তানেরা যে অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন-
সন্তানের অধিকার: সন্তানের পিতৃত্ব বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রমাণের ক্ষেত্রে কাবিননামা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রেজিস্ট্রি না থাকলে সন্তানের ভবিষ্যৎ অধিকার (যেমন: পিতার সম্পত্তি) নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এছাড়াও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের পাশাপাশি, মৃতের সন্তানদের উত্তরাধিকার, স্ত্রীর ভরণপোষণ ও মোহরানা, খোরপোষ ইত্যাদির অধিকার নিয়ে চরম জটিলতা সৃষ্টি হয়।
অন্যান্য প্রমাণ: পাসপোর্ট বা ভিসা প্রক্রিয়াকরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় পিতার নাম প্রমাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।
পাশাপাশি, বিয়ে নিবন্ধন করা না থাকলে বিদেশে গমন বা ইমিগ্রেশনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বিয়ের সনদ ও কাবিননামা বিভিন্ন দেশের ভিসা ও ইমিগ্রেশনে একটি অপরিহার্য দলিল।
যা করতে হবে: আইনে বলা আছে, মাওলানা বা হুজুরের মাধ্যমে অর্থাৎ ধর্মীয় বিধান মেনে বিয়ে সম্পন্ন হবার পর যেদিন বিয়ে সম্পন্ন হবে সেদিন অথবা সেদিন থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে বিয়ের নিবন্ধন করাতে হবে। আবারও জানাচ্ছি, বিয়ে নিবন্ধন করার দায়িত্ব স্বামীর ওপর থাকে।
উল্লেখ্য যে, নিবন্ধন না করলেও বিয়েটি অবৈধ হয়ে যাবে না।
আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। যদি আপনার বিয়ে রেজিস্ট্রি করা না হয়ে থাকে, তবে দ্রুত তা সম্পন্ন করার জন্য এবং আইনি জটিলতা এড়াতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।