নারীকে আজও পণ্য বা স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে দেখছে যে আইন!

পরকীয়া কিন্তু নারী পুরুষ উভয় পক্ষেরই অপরাধ। কিন্তু স্বামী যখন পরকীয়া করেন, সমাজ তখন কারণ খোঁজে- হয়তো স্ত্রী যত্ন নেয়নি, স্ত্রীর কোন সমস্যা আছে, অথবা স্ত্রী ভালো হলে তো স্বামীর পরকীয়া করার কথা নয়! অন্যদিকে একজন স্ত্রী যখন পরকীয়া করে, সমাজ তাকে এক মুহূর্তেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তিনি মুহুর্তে হয়ে যান পৃথিবীর সবথেকে নিকৃষ্টতম অপরাধী।

একই ঘটনা অথচ দুটি ভিন্ন প্রবাহ! কেন? পুরোটাই কি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নাকি আইনও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে? পরকীয়ার মতো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিপর্যয়ে কেন আমাদের সমাজ সবসময় নারীর দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলে? এই লুকানো পক্ষপাত কি আইনের ভুল ব্যাখ্যার ফল?

আজও এই বাংলাদেশে কিছু আইনি ব্যাখ্যা রয়ে গেছে, তাতে নারীকে কোন চোখে দেখা হচ্ছে, জানুন…

আসুন, সমাজ ও আইন- উভয়ের প্রেক্ষাপটে এই কঠিন সত্যটি বিশ্লেষণ করা যাক এবং পরকীয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারীর আইনি সুরক্ষা কী, তা জেনে নেওয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা: সমাজের পক্ষপাত ও আইনি বাস্তবতা-
বাংলাদেশের সমাজে পরকীয়ার ক্ষেত্রে যে পক্ষপাত দেখা যায়, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি হলো দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৭ ধারা, যা এখনও পরকীয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর একমাত্র আইন হিসেবে রয়ে গেছে।

দণ্ডবিধি ৪৯৭, যার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে নারীর বিরুদ্ধে এক বিরল ভয়াবহতা! এই ধারায় ব্যভিচার বা পরকীয়ার জন্য শুধু পুরুষের শাস্তি হয়, কিন্তু নারীর কোনো শাস্তি নেই। নারীকে আজও পণ্য বা স্বামীর মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি হিসেবেই বিবেচিত করছে এই আইন।

তার আরেকটি জ্বলজ্যান্ত উদহারণ হচ্ছে, এমনকি, স্বামী যদি স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কের অনুমতি দেন, তবে সেই পুরুষেরও কোনো অপরাধ হয় না! কথাগুলো দণ্ডবিধি ধারা ৪৯৭ মাঝেই লুকিয়ে আছে! এগুলো আমার কথা নয়।

আইনি সুরক্ষা (নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য)-

বিবাহবিচ্ছেদের কারণ: বর্তমানে পরকীয়া মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন (১৯৩৯) বা পারিবারিক আদালত আইন (১৯৮৫) অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের একটি শক্তিশালী কারণ হিসেবে কাজ করে। নারী বা পুরুষ, যে পক্ষই পরকীয়ার শিকার হন, তিনি এই কারণে আদালতে ডিভোর্স চেয়ে আবেদন করতে পারেন।

ক্ষতিপূরণ: পরকীয়ার শিকার নারী ডিভোর্সের পাশাপাশি তার দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্বের জন্য আইনি সুরক্ষা পান। এটুকুই!

ভুল ধারণার ভূত: আইনিভাবে নারী বা পুরুষ কেউই পরকীয়ার জন্য আর কিছুই বিশেষ প্রতিকার পাবেন না বা পান না! কিন্তু সমাজ আজও সেই পুরোনো ৪৯৭ ধারার মানসিকতা বহন করে চলছে, যেখানে পরকীয়ার দায় নারীর ওপর বেশি চাপানো হয়। (আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, এদেশের নারীরা কবে জাগবেন? নারীর মর্যাদার উপর এইযে ঐতিহাসিক পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর পাথর চেপে বসে আছে, সেটা তারা কবে উপলব্ধি করবেন, কবে ভাঙ্গবেন?)

আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, পরকীয়ার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। তাই পারিবারিক কলহ বা সন্দেহের শুরুতেই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top