স্বামী কি চাইলেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন? স্ত্রী কি তা আটকাতে পারবেন?
গল্প দিয়েই বলি ব্যাপারটা। সংসারের দশটি বছর পার করার পর ‘মরিয়ম’ হঠাৎ জানতে পারলেন তার স্বামী অন্য এক জায়গায় বিয়ের কথা পাকাপোক্ত করেছেন। মরিয়মের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি ভাবলেন, “আমি তো এখনো তার স্ত্রী, আমার অনুমতি ছাড়া তিনি কীভাবে আবার বিয়ে করবেন? আইন কি আমাকে কোনো সুরক্ষা দেবে না?”
আবার অনেক নারীই এই ভুল ধারণায় ভোগেন যে, মুসলিম আইনে পুরুষদের চারটি বিয়ের অধিকার আছে বলে তারা যখন খুশি বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের আইন এই অধিকারকে কঠোর শর্তের অধীনে রেখেছে। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের বিনা অনুমতিতে বা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে আপনি আইনিভাবেই তা আটকাতে পারেন।
কীভাবে একজন স্ত্রী তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে প্রতিরোধ করবেন? আইনের ধারাই বা কী বলে? চলুন, বিষয়টি বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক। আইনগত ব্যাখ্যা: দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর স্ত্রীর অধিকার
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, স্বামী চাইলেই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি (সালিসি পরিষদের মাধ্যমে) ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না।
আইনি বাধ্যবাধকতা-
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুসারে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিসি পরিষদের কাছে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। সালিসি পরিষদ প্রথম স্ত্রীর কাছে লিখিত অনুমতি বা সম্মতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন বিবেচনা করবেন।
এ আবেদনে অন্যান্য যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে- ১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব ২. মারাত্মক শারীরিক দুর্বলতা ৩. দাম্পত্যজীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা ৪. দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালত থেকে প্রদত্ত কোনো আদেশ বা ডিক্রি বর্জন ও ৫. মানসিকভাবে অসুস্থতা, ইত্যাদি। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়।
কোনো পুরুষ যদি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি অবিলম্বে তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের আশু বা বিলম্বিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীরা আদালতে মামলা করে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার অধিকার রাখেন।
দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি ভরণপোষণ পাবেন। এ ক্ষেত্রে নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে হবে বাবাকে। ভরণপোষণের পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের উত্তরাধিকারীর অধিকার কোনো অবস্থাতেই খর্ব হবে না।
স্ত্রীর ভূমিকা: স্ত্রী যদি অনুমতি দিতে না চান, তবে তিনি সালিসি পরিষদের কাছে তার আপত্তি যৌক্তিক কারণে তুলে ধরতে পারেন।
দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর উপায়:
যদি স্ত্রী জানতে পারেন যে স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগ নিচ্ছেন, তবে স্ত্রী অবিলম্বে সালিসি পরিষদে (স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান/মেয়রের কাছে) আবেদন করতে পারেন এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগে আপত্তি জানাতে পারেন।
নিষেধাজ্ঞা: স্ত্রী পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর জন্য নিষেধাজ্ঞার (Injunction) আবেদনও করতে পারেন। আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্বিতীয় বিয়ের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন।
পরিণতি ও শাস্তি: যদি স্বামী সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি ফৌজদারি অপরাধ করেন এবং তার এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এছাড়াও দণ্ডবিধির আওতায় মামলা করার সুযোগ রয়েছে। সেখানে শাস্তিরও ভিন্নতা আছে। সেটা নিয়ে অন্যদিন আলোচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, এখানে বাংলাদেশের আইনের আলোকে আলোচনা করা হল। যা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য।
আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।