অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন কাজী যদি তার দায়িত্বের প্রতি অনড় থাকেন; তবে বহু নারী স্বামীর গোপন বিয়ে থেকে রক্ষা পাবেন! তাই নিয়মকানুনগুলো শুধু কাজী নয় জানতে হবে আপনারও…
স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, এমন অনেক নারী আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, “কাজী সাহেব কি বিয়ে রেজিস্ট্রি করার আগে, সালিসি পরিষদের অনুমতিপত্র দেখেছেন? অনুমতি পত্র না থাকলে তো কাজী কাবিননামা তৈরি করতে পারেন না।” আবার অনেকেই মনে করেন, কাজী অফিস হলো একটি আইনি দপ্তর, তাই কাজীর ওপরই নির্ভর করে দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতা!
ধরা যাক, কোন ব্যক্তি তার প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়েই গোপনে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য কাজীর কাছে গেলেন। সেই ব্যক্তিকে কি কাজী শুধু মৌখিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বিয়ে পড়িয়ে দিতে পারেন? নাকি কাজীরও কিছু কঠোর আইনি দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা আছে, যা না মানলে তিনি নিজেও শাস্তির মুখে পড়বেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে অনেক নারীই তাদের স্বামীর গোপনে করা দ্বিতীয় বিয়ের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন।
আসলে, কাজী কেবল একজন ধর্মীয় ব্যক্তি নন, তিনি সরকার কর্তৃক নিযুক্ত একজন প্রতিনিধি বা কর্মকর্তা। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কাজীর দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা কী, তা জানা থাকলে সমাজে দ্বিতীয় বিয়েজনিত প্রতারণা অনেকাংশে কমবে। চলুন, এই বিষয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলছে, তা স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: দ্বিতীয় বিয়ে পড়ানোর ক্ষেত্রে কাজীর দায়িত্ব-
বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হলেন রাষ্ট্রের নিযুক্ত একজন প্রতিনিধি। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব কঠোরভাবে নির্ধারিত।
মুসলিম পুরুষের বহুবিবাহের ক্ষেত্রে কাজীর দায়িত্ব-
আইনি বাধ্যবাধকতা: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার কোনোভাবেই সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে পারেন না।
কর্তব্য: কাজী বা রেজিস্ট্রারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, বরের হাতে সালিসি পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক ইস্যুকৃত দ্বিতীয় বিয়ের লিখিত অনুমতিপত্র আছে। যেখানে সালিসি পরিষদ তার প্রথম বউয়ের, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে লিখিত মতামত যুক্ত আছে।
সীমিতকরণ: যদি পুরুষটি সালিসি পরিষদের অনুমতিপত্র দেখাতে না পারেন, তবে কাজীর দায়িত্ব হলো সেই বিয়ে পড়ানো বা রেজিস্ট্রি করা থেকে বিরত থাকা।
মুসলিম নারীর বহুবিবাহের ক্ষেত্রে কাজীর দায়িত্ব-
আইনি সীমাবদ্ধতা: মুসলিম নারীর জন্য বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাজী বা রেজিস্ট্রার যদি জানেন যে, কনে বিবাহিত এবং তিনি বিবাহিত এবং তালাকপ্রাপ্ত নন বা তার তালাক কার্যকর হয়নি অথবা ইদ্দতকাল চলছে, তবে সেই বিয়ে পড়ানো বা রেজিস্ট্রি করা কাজীর জন্য আইনত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি-
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, যদি কোনো নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজী আইন লঙ্ঘন করে বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে আইন অমান্য করেন, তবে তার লাইসেন্স বাতিল হতে পারে এবং হতে পারে জেল জরিমানাসহ অন্যান্য শাস্তি।
ফৌজদারি দায়: জেনে শুনে বহুবিবাহে সহযোগিতা করলে, কাজী দণ্ডবিধি ৪৯৪/৪৯৫ ধারা অনুযায়ী অপরাধে সহযোগিতার জন্য গুরুতর ফৌজদারি দায়ে অভিযুক্ত হবেন।
আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। কোনো কাজী যদি বেআইনিভাবে বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।