কিশোরীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মৌলভী সাহেবের মাধ্যমে তার বিয়ে দেওয়া হলো। ছেলেপক্ষ, মেয়েপক্ষকে বললেন, ‘১৮ বছর পূর্ণ হলেই ৫ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি করা হবে। এখন শুধু হুজুর দিয়ে বিয়ে পড়ান হোক।’ এই মৌখিক আশ্বাসে মেয়েটিকে স্বামীর সাথে পাঠিয়ে দেয়া হল।
তাদের সংসার চলল পরবর্তী চার বছর। গতকাল আমার কাছে আসা একটি সমস্যার আলোকে লেখা আজকের প্রতিবেদনটি।
কিন্তু ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যখন কাবিন করার কথা বলা হলো, তখন স্বামীর পরিবার নানা টালবাহানা শুরু করল। ‘আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু’ করতে করতে কাবিননামা আর হলো না। একসময় মেয়েটি জানতে পারলো, তার স্বামী তাকে না জানিয়ে গোপনে অন্য এক জায়গায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। করেছে বললে ভুল হবে, স্বামীর পরিবারই অনেক টাকা পণ (যৌতুক) নিয়ে বিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু মেয়ের পরিবার তখন দিশেহারা- তাদের কাছে প্রথম ‘বিয়ে’র তো কোনো আইনি দলিলই নেই। ৫ লক্ষ টাকার দেনমোহর তো দূরের কথা, সেই কিশোরী কন্যার চার বছরের সংসার আর পুরো বিয়েই তখন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে!
এই ঘটনা শুধু একজন কিশোরীর নয়। এমন বহু বাল্যবিবাহ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের জীবন আজ হুমকির মুখে। এই ক্ষেত্রে তার অধিকার কী? এই বাল্যবিবাহ দেওয়ার জন্য ছেলে-মেয়ে দুই পক্ষের অভিভাবক, এমনকি সেই মৌলভী ও কাজীরই বা কী শাস্তি হতে পারে? চলুন, এই গুরুতর আইনি বিষয়গুলো পরিষ্কার করে জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: বাল্যবিবাহ, পরিণতি ও শাস্তি
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ এবং একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
বাল্যবিবাহের সংজ্ঞা: বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, অনুযায়ী, পুরুষের ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিবাহকে বাল্যবিবাহ বলা হয়।
বাল্যবিবাহের পরিণতি ও শাস্তি:
শাস্তি (অভিভাবকদের): বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিবাহ দিলে বা দিতে সহায়তা করলে বর-কনের প্রাপ্তবয়স্ক পিতামাতা, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
হুজুর বা কাজী অথবা রেজিস্ট্রারে শাস্তি: বিবাহ সম্পাদনকারী কাজী, মৌলভী বা রেজিস্ট্রার বাল্যবিবাহ পড়ালে তাদের ছয় মাস থেকে দুই বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ঝুঁকিসমূহ: যেহেতু মেয়েটির আইনত বিয়ের বয়স হয়নি, বা বিবাহটি অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় হয়েছে এবং তা রেজিস্ট্রি হয় না। ফলে পরবর্তীকে তালাক বা অন্যকোন বাঁধা বিপত্তির সম্মূখীন হলে এর প্রতিকার পাওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অল্প বয়সে বিয়ের ফলে শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে সম্পর্কে পড়ে অন্য কোন সময় আলোচনা করা যাবে।
একদিকে যেমন, বয়স কম হওয়ার কাবিন করা যায় না। ফলে মেয়েটির দেনমোহরসহ অন্যান্য অধিকার অনিশ্চয়তা পড়ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে তালাক বা অন্য কোন সমস্যায় প্রতিকারের পথ প্রায় নেই বললেই চলে। আর অভিভাবক ও কাজীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের শাস্তির বিধান তো রয়েছেই।
আপনার জন্য পরামর্শ:
বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে সময়মতো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।