স্বামী বাসায় ঢোকে, কিন্তু মনটা ঢোকে না অনেক বছর। একই বিছানায় ঘুম, তবু দু’জনের মাঝখানে থাকে বিশাল এক দূরত্ব। এমন দূরত্ব, যা চোখে দেখা যায় না- কিন্তু হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দেয় প্রতিদিন। ফোনটা হাতে নিয়ে সে (স্ত্রী) বসে থাকে অনেক রাত অবধি। আগের মতো আর কেউ জিজ্ঞেস করে না, “খেয়েছো?”, “ঘুমাবে না?”
তিনি (স্ত্রী) আনমনে ভেবে চলেন, “আমার কি তবে বিয়ে ভেঙে গেছে?” কিন্তু আবার পরক্ষণেই নিজেকে নিজেই বলেন, “না তো, কোর্টকাচারিতে তো কেউ যায়নি। নোটিশ, কাজী অফিস, সালিসি বোর্ড ইত্যাদি করা হয়নি কখনও। তালাক তো হয়নি আমাদের!”
তবু সে জানে, মানুষটিকে হারিয়েছে সে; দিনের আলোয়, সংসারের মধ্যেই আস্ত মানুষটাকে! একই ছাদের নিচে থেকেও, সে একা, সম্পূর্ণ একা। এই অবস্থাকে বলে সাইলেন্ট ডিভোর্স (Silent Divorce)। রাষ্ট্রিয় আইনে এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ে টিকে আছে, কিন্তু সম্পর্ক মৃত।
সাইলেন্ট ডিভোর্সের লক্ষণগুলো-
– উভয়ের প্রতি আগ্রহের অভাব।
– কথোপকথন নেই বললেই চলে।
– মানসিক দূরত্ব আকাশ সমান।
– নীরব অথচ স্পষ্ট অবহেলা।
– সব রকম শারীরিক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া।
– শুধু সাংসারিক দায়িত্বগুলো টিকে আছে, কিন্তু অনুভূতি নেই।
– কখনো কখনো বাসায় থাকলেও ‘স্বামী’ হিসাবে তিনি যেন চুড়ান্ত ভূমিকাহীন, নির্লিপ্ত।
অনেক নারী এই অবস্থায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন, কারণ সমাজ বলে, “বিয়ে আছে, তাই সংসার আছে।” কিন্তু আসলে, যেখানে ভালোবাসা নেই, সেখানে সংসার শুধু একটি কাঠামো, দিন পার করবার অপচেষ্টা মাত্র।
আইন কী বলে? এই অবস্থায় নারীর করণীয়?
বাংলাদেশের আইন নীরব তালাক বা Silent Divorce বলে কোন শব্দ নেই। এই শব্দের ব্যবহার না করলেও, মানসিক-দাম্পত্য বিচ্ছিন্নতা আইনি ভিত্তি তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিকার পাওয়ার:
– বিবাহ বিচ্ছেদ (Dissolution of Marriage)- ন্যায়সঙ্গত কারণ। স্বামী দীর্ঘদিন সম্পর্কহীন, অবহেলা, দাম্পত্য অধিকার লঙ্ঘন করলে এটি বিবাহ বিচ্ছেদের একটি বৈধ কারণ।
– ভরণপোষণ (Maintenance) দাবি। স্বামী যদি আর্থিক, মানসিক বা দাম্পত্য দায়িত্ব না নেন, স্ত্রী Family Court-এ খোরপোষ মামলা করতে পারেন।
– দাম্পত্য সম্পর্ক পূনরুদ্ধার (Conjugal Rights Restoration) মামলা। স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী থেকে দূরে থাকলে, এই মামলা দাম্পত্য দায়িত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য করা যায়।
– পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ (Domestic Violence Act, 2010) “মানসিক নির্যাতন” এই আইন অনুযায়ী একটি শারীরিক নয় এমন সহিংসতা এবং স্ত্রী সুরক্ষা আদেশ/পৃথক বসবাসের আদেশ/আর্থিক সমায়তা (Protection Order/Residence Order/Monetary Relief) চাইতে পারেন।
কিন্তু প্রশ্ন- সবকিছু কি বিচ্ছেদেই শেষ?
না। অনেক সময় Silent Divorce শুরু হয়, ভুল বোঝাবুঝি, যোগাযোগের অভাব, মানসিক চাপ এবং সবথেকে বেশি সেই অতিপরিচিত কারণ “পরকীয়া”। সঠিক সময়ে কথা বলা, কাউন্সেলিং ও আইনি পরামর্শ, অনেক সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে।
সোজা কথা:
নীরব তালাক বা Silent Divorce মানে বিয়ে ভাঙেনি, কিন্তু সম্পর্ক বেঁচে নেই। একে অবহেলা করবেন না। সমস্যাটাকে চেনা, বোঝা, তারপর আইনি ও মানসিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া, এটাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।