স্ত্রী বর্তমান রেখে, স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তবে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে। এই একটা ছোট্ট স্ট্যাটাস ফেসবুকে বা অন্য কোন সোশ্যাল মিডিয়ায় দিলে মূহুর্তেই কিছু মানুষ এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। কেননা, তাদের বক্তব্য মুসলিম শরিয়া অনুসারে অনুমতির দরকার হয় না। আমি সেই তর্কে যেতে চাই না।
আমি বাংলাদেশে আইনজীবীদের লাইসেন্স প্রদানকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে আইন কানুনগুলো প্রচলিত, সেগুলোর ভিত্তিতে কথা বলব। কেননা, সেটাই আমার কাজ। এর অন্যথা করার কোন সুযোগ আমার নেই।
এবার মূল প্রসঙ্গে যাই। দ্বিতীয় বিয়ের জন্য স্ত্রী অনুমতি লাগবে নাকি লাগবে না, এই তর্কের মাঝে যেটা হারিয়ে গেছে সেটা হলো, সালিসি পরিষদের অনুমতি! মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুসারে, স্ত্রী বর্তমান রেখে, স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে সালিসি পরিষদের অনুমতি লাগবে। চলুন এ প্রসঙ্গে আইনের ভেতর-বাহির সবটুকু বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক-
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিসি পরিষদ (Arbitration Council) একটি অপরিহার্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী, বিদ্যমান স্ত্রী থাকাবস্থায় সালিসি পরিষদের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না।
সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হাইকোর্টের একটি রায়ে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর ব্যক্তিগত বা মৌখিক সম্মতিই যথেষ্ট নয়, বরং সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।
পরিষদের গঠন ও আবেদন প্রক্রিয়া-
পরিষদ গঠন: সালিসি পরিষদ গঠিত হয় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্মকর্তা), আবেদনকারী স্বামী এবং বিদ্যমান স্ত্রীর মনোনীত একজন করে প্রতিনিধি (মোট ৩ জন) নিয়ে।
আবেদন: দ্বিতীয় বিয়ে করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে নির্ধারিত ফি-সহ চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করতে হয়। আবেদনে দ্বিতীয় বিয়ের কারণ এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হয়।
শুনানি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ-
যৌক্তিকতা যাচাই: আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে তাদের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য বলেন। এরপর পরিষদ উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনে এবং প্রস্তাবিত বিয়েটি “প্রয়োজনীয় এবং ন্যায়সঙ্গত” কি না, তা বিচার করে।
অনুমতি প্রদান: পরিষদ সন্তুষ্ট হলে কিছু শর্ত সাপেক্ষে বিয়ের অনুমতি দিতে পারে। সিদ্ধান্ত প্রদানের সময় পরিষদকে অবশ্যই তার কারণগুলো নথিবদ্ধ করতে হয়।
আপিল: যদি কোনো পক্ষ পরিষদের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হয়, তবে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আদালতের কাছে পুনর্বিচারের (Revision) জন্য আবেদন করতে পারেন। আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়।
অনুমতি ছাড়া বিয়ে করার আইনি পরিণতি-
সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্বামী নিম্নলিখিত আইনি পরিণতির সম্মুখীন হন:
তৎক্ষণাৎ দেনমোহর পরিশোধ: বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের সম্পূর্ণ দেনমোহর (তৎক্ষণাৎ এবং বিলম্বিত উভয়ই) অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে। পরিশোধ না করলে তা বকেয়া ভূমি রাজস্ব হিসেবে আদায় করা যেতে পারে।
ফৌজদারি দণ্ড: অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা একটি অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে স্বামীর এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
রেজিস্ট্রেশন বাধা: সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো দ্বিতীয় বিয়ে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইনের অধীনে আইনত রেজিস্ট্রি করা যাবে না। আপনার জন্য পরামর্শ-
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে আইনিভাবে শাস্তিযোগ্য। সঠিক পদক্ষেপ ও আইনি সুরক্ষার জন্য অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।