‘খোলা তালাক’ যেখানে দেনমোহরের বিনিময়ে নারী মুক্তি কিনে নেন!

কাবিননামায় লেখা দেনমোহরের দশ লাখ টাকার রোকসানাকে ছেড়ে দিতে হবে। হ্যাঁ সম্পূর্ণভাবেই ছেড়ে দিতে হবে। স্বামী তাকে বলেছে, “তুমি যেহেতু আমাকে চাও না, আমার কাছ থেকে মুক্তি চাইছো, তাই তোমাকে দেনমোহর ছেড়ে দিতে হবে।” রোকসানা তার মুক্তির জন্য সত্যি সত্যি দেনমোহর ছাড়তে প্রস্তুত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি একটা উত্তর খুঁজছেন- এই দেনমোহর তো তার আইনগতভাবে প্রাপ্য অধিকার, যা স্বামীর জন্য পরিশোধে বাধ্য।

তবে কেন তাকে তার অধিকার বিসর্জন দিয়ে বিচ্ছেদ কিনতে হচ্ছে! এটি কি তার প্রাপ্য অধিকারের ওপর স্বামীর চরম জুলুম নয়? তিনি কি এই টাকা কোনোভাবেই ফেরত পেতে পারেন না? কিছুদির আগের ঘটনা এটি, মেসেজের মাধ্যমে রোখসানা আমার কাছে উত্তর জানতে চেয়েছিলেন। আজ মনে হলো, লিখি সেটা নিয়ে।

রোকসানার ভাষ্যমতে, দাম্পত্য জীবন তার কাছে ছিল এক বন্দিশালা, যেখানে ভালোবাসা তো দূরের কথা নূন্যতম সম্মানটুকু ছিল না। উপরন্ত উঠতে বসতে জুটতো গালি-গালাজ, চড়থাপ্পর! তিনি স্বামীর নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি চাইলেন, কিন্তু স্বামী তাকে সহজে তালাক দিতে নারাজ। অবশেষে এক কঠিন শর্তে স্বামী তাকে মুক্তি দিতে রাজি হলেন। যাক আইনের পরিভাষায় বলা হয় ‘খোলা তালাক’ বা ‘খুলা তালাক’।

বাংলাদেশে বহু নারী আছেন, যারা বিষাক্ত দাম্পত্য থেকে বের হতে গিয়ে দেনমোহরের অধিকার বিসর্জন দিতে বাধ্য হন। তালাকের এই প্রক্রিয়াটি কী, কেন এখানে দেনমোহর ছেড়ে দিতে হয়, আর আইনই বা এ ব্যাপারে নারীকে কতটুকু সুরক্ষা দিচ্ছে? চলুন, এই বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা: খোলা তালাক ও দেনমোহরের বিসর্জন
খোলা তালাক (Khula Divorce) হলো এমন এক ধরনের বিবাহ বিচ্ছেদ, যা স্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত হয় এবং স্বামীর সম্মতিতে সম্পন্ন হয়। এটি ইসলামি আইন এবং বাংলাদেশের পারিবারিক আইনে স্বীকৃত।

খোলা তালাক কী? এটি স্ত্রীর উদ্যোগে শুরু হয়, যেখানে স্ত্রী বিচ্ছেদ চান এবং এর বিনিময়ে স্বামীকে কিছু আর্থিক সুবিধা দেন। সাধারণত এই সুবিধা হলো স্ত্রীর দেনমোহরের কিছু অংশ বা পুরোটা ছেড়ে দেওয়া।


দেনমোহর কমানো বা ছেড়ে দেওয়া-
ইওয়াজ বা বিনিময়: খোলা তালাকের মূলনীতি হলো, স্ত্রী বিচ্ছেদের বিনিময়ে স্বামীকে কিছু ‘ইওয়াজ’ (বিনিময়) প্রদান করবেন। সাধারণত এই ‘ইওয়াজ’ হলো দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ ছেড়ে দেওয়া, যা স্বামী এখনও পরিশোধ করেননি। আর পরিশোধ করলে, সেখান থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়া।

এমনকি স্বামী যদি দেনমোহরের বাহিরে আরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন স্ত্রীর কাছ থেকে, তাতেও তালাক সম্পন্ন হতে কোন বাঁধা নেই, যদি স্ত্রী সেটা পরিশোধ করতে সম্মত হন!

আইনের প্রেক্ষাপট: আদালত প্রথমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন। যদি সমঝোতা না হয় এবং আদালত মনে করেন, স্বামীর সঙ্গে থাকা স্ত্রীর জন্য অসম্ভব বা ক্ষতিকর, তবে আদালত খুলা তালাকের ডিক্রি জারি করতে পারেন। এই সময় দেনমোহর ছাড়ার বিষয়টি চুক্তি বা সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

স্ত্রী আদালতকে জানাতে পারেন যে, তিনি দেনমোহর সম্পূর্ণ বা আংশিক ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক। যদিও এ তালাক সম্পন্ন হবার জন্য আদালতে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। পারস্পরিক ‘পারস্পরিক সমঝোতামূলকভাবে’ এটি সম্পন্ন হতে পারে।  

প্রাপ্য দেনমোহর: যদি দেনমোহর পরিশোধিত হয়ে যায়, তবে স্বামীকে আর কিছু দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। আর যদি তা আংশিক বকেয়া থাকে, তবে সেই বকেয়া অংশই সাধারণত ‘বিনিময়’ হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয়। মোট কথা, খোলা তালাক হলো স্ত্রীর ইচ্ছায় বা উদ্যোগে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদ, যেখানে স্ত্রী সাধারণত দেনমোহর বা নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ স্বামীকে ফেরত দেয়।
আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, দেনমোহর ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি চুক্তিনির্ভর। দেনমোহরের সঠিক পরিমাণ, বকেয়া অংশ এবং আপনার আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top