দেনমোহর নির্ধারণের পদ্ধতিগুলো কী কী? সময়ের প্রেক্ষাপটে দিনে দিনে প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেনমোহর নির্ধারণকে কেন্দ্র করে একটা সময় বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা চোখে পড়তো অহরহ। আর এখন, সেই দেনমোহর যেন কোন কোন অবস্থায় ‘ব্যবসায়’ পরিণত হয়েছে। সে সম্পর্কে অন্য কোন সময় আলোচনা করা যাবে। আজ দেনমোহর নির্ধারণ এবং এর আইনগত দিকগুলো জেনে নেয়া যাক।
অনেকেই বিয়ের সময় দেনমোহরকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। মনে করেন, এটা লোক দেখানো ব্যাপার। আবার কেউ কেউ সামাজিকতার জন্য ইচ্ছেমত দেনমোহর নির্ধারণ করে থাকেন। অন্যদিকে, ইদানিং স্বামীকে সংসার করতে বাধ্য করার নিমিত্তে, বা সংসার রক্ষার ‘হাতিয়ার’ হিসেবে কল্পনাতীত বেশি পরিমাণ দেনমোহর নির্ধারণ করে বিয়ে দেয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করা যায়।
দেনমোহর স্ত্রীর একটি আইনগত অধিকার এবং স্বামীর ওপর একটি ঋণ। এই দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে, যা অনেকেই জানেন না। ইদানিং যা দেখা যাচ্ছে, অনেকে দেনমোহরের ক্ষেত্রে আকাশছোঁয়া একটা অঙ্ক লিখে দেন, যা পরবর্তীতে উভয় পক্ষের জন্যই বিশাল জটিলতা তৈরি করে।
এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকার কারণে অনেক নারী তাদের প্রাপ্য দেনমোহর থেকে বঞ্চিত হন, আবার অনেক পুরুষও ভয়াবহ আর্থিক চাপে পড়ে যান; একসময় অনাদায়ী-ই থেকে যায় জরুরি এই ঋণটি। আর ততোধিক জরুরি বিষয় হলো, বিয়ের দিন যে দেনমোহর লিখা হবে কাবিনে, পরবর্তিতে, দেনমোহর আদায়ে আদালতে গেলে, আদালত সেই নির্ধারিত দেনমোহর-ই প্রদান করতে বাধ্য করবেন।
দেনমোহর ধার্য করার ক্ষেত্রে উত্তম পন্থা হলো-
১. স্ত্রীর বংশে তার সমমানের নারীদের বাস্তবসম্মত দেনমোহর যা ইতিপূর্বে ধার্য হয়েছে, (কোথাও কোথাও মা খালাদের ধার্য দেনমোহরের বলা হয়েও, বর্তমান সময়ের অর্থের অবম্যূলায়ন বিবেচনায় সেটা যুক্তিযুক্ত হবে না, বিধায় স্ত্রীর অন্যান্য বোন বা ভাবীদের দেনমোহর বিবেচনা করা যেতে পারে)। সেই সাথে স্ত্রীর সামাজিক অবস্থানও বিবেচনা করা। এবং
২. স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য- স্বামীর আর্থিক অবস্থার বিবেচনা, তিনি যে পরিমাণ দেনমোহর দেয়ার সামর্থ্য রাখেন; এ দুটি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে মোহর নির্ধারণ করা।
৩. এছাড়া উভয় পক্ষের উদ্যোগে সৃষ্ট কোন পারস্পরিক সমঝোতায় দেনমোহর নির্ধারণ করা যেতে পারে। আবারও বলছি, যেহেতু ইসলামি শরিয়ত ও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহরকে নিদির্ষ্ট করে দেয়া হয়নি; সেক্ষেত্রে উপরোক্ত পদ্ধতিগুলো দেনমোহর নির্ধারণের উত্তম পন্থা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখবেন, দেনমোহর যেহেতু পুরোটাই পরিশোধ করার বিষয়, শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বেশি পরিমাণ মোহর ধরা যাবে না। আর যদি সেভাবে নির্ধারণ করা হয়, তবে সেই মোহরানা পুরোটাই স্ত্রীর প্রাপ্য এবং তা পুরোপুরিই স্ত্রীকে প্রদান করতে হবে।
আর একটি তথ্য এক্ষেত্রে বলা উচিত, অনেকে ছলে-বলে-কৌশলে স্ত্রীকে দেনমোহর থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেন। বহুকাল থেকে অতি ভালোবাসার ছল করে ‘দেনমোহর মাফ’ করিয়ে নেওয়ার অপসংস্কৃতি চালু রয়েছে আমাদের সমাজে, যা ইসলাম সমর্থন করে না।
যে স্বামীর মনে স্ত্রীর দেনমোহর আদায়ের ইচ্ছাটুকুও নেই, হাদিস শরিফে তাকে বলা হয়েছে ‘ব্যভিচারী’। এই রেফারেন্সটুকু ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৪/৫২২-৫২৩)।
১. আইনি পরামর্শ: দেনমোহর সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
২. স্বচ্ছতা: দেনমোহর নির্ধারণের সময় বাস্তবতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখুন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিতর্ক না হয়।