আধুনিক দাম্পত্যের নতুন মেরুকরণ!
একই ছাদের নিচে থেকেও নীরবে বিচ্ছেদের জীবন কাটাচ্ছেন- এটাকেই এ যুগের পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘সাইলেন্ট ডিভোর্স বা নীরব বিচ্ছেদ’। হয়তো নিজেদের অবচেতনে দিন দিন বেড়ে চলেছে দূরত্বটুকু। বুঝতেই তো পারছেন না। তাহলে ঠিক করবেন কীভাবে? শেষ অবধি কোন বড় অঘটনই না ঘটে যায়! জানুন বিস্তারিত।
আইনি বিচ্ছেদ ছাড়াও কোনো কোনো দম্পতি সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বর্তমানে এদেশে এমন দম্পতির সংখ্যা নেহাত কম নয়, যারা বিবাহ সূত্রে একই ছাদের নিচে বাস করছেন, কিন্তু নীরবে বিচ্ছেদের জীবন কাটাচ্ছেন। এই দম্পতিদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্বাভাবিক আবেগের দিকটি হারিয়ে যায়।
সাধারণত মনের বিচ্ছেদের কথা সমাজের সামনে আনতেও চান না কোন দম্পতি। তাই কিছু বুঝতেও দেন না কাউকে। সমাজের চোখে তাদের অনেকেই হয়তো সুখী দম্পতি। সকল অধিকার নিয়ে, স্বামী-স্ত্রী কাগজে-কলমে একসাথে এক ঘরে রয়েছেন, কিন্তু মানসিকভাবে তারা একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে।
অনেকেই মনে করেন পরকীয়াই এর একমাত্র কারণ। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণাপত্র ও রেফারেন্সসমূহ পর্যালোচনা করে পরকীয়া ছাড়াও অন্যান্য যে কারণগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তাই তুলে ধরছি আপনাদের সম্মুখে।
১. বিশ্বাসের ঘটতি: প্রতিটি সম্পর্কের ভিত-ই হলো বিশ্বাস। এই বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে গেলে সম্পর্কে চিড় ধরবেই।
২. আবেগীয় অবহেলা: একজনের বিপদে বা কষ্টে অন্যজনের উদাসীনতা। ছোট ছোট অভিমান জমা হতে হতে একসময় নীরবে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, যদি অপর পক্ষ এ অভিমানকে গুরুত্ব না দেয়।
৩ যোগাযোগের অভাব: সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকা কিন্তু সঙ্গীর সাথে কথা বলার সময় ‘বিরক্তি’ বোধ করা। এটি একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। যা সাইলেন্ট ডির্ভোসের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৪. দায়িত্ব এড়ানো: সাংসারিক বা আর্থিক দায়িত্বে কোনো একজনের একতরফা অনীহা। যা দিনে দিনে বাড়তে বাড়তে একটা সময় বিস্ফোরণ ঘটায়।
৫. দীর্ঘদিনের ক্ষোভ: স্নেহ-মমতাহীন সম্পর্ক, পারস্পারিক শ্রদ্ধা ভালোবাসার চেয়ে বড় করে দেখা দেয় একে অপরের প্রতি অসম্মান দেখানো। এগুলো অনেকটা নীরবেই ঠেলে দেয় বড় কোন অঘটনের দিকে।
৬. সন্তান, অর্থ এবং সামাজিক ভয়ের কারণে কেবল একই ছাদের নিচে থাকতে বাধ্য হন অনেক দম্পত্তি। এছাড়াও, অতিরিক্ত আধিপত্য, বড় ধরনের আর্থিক সংকট কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতের অমিলের কারণেও সম্পর্ক ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যেতে পারে। দাম্পত্যের স্বাভাবিক চাহিদা বা একে অন্যের প্রতি স্বাভাবিক নির্ভরশীলতা নষ্ট হলেও একসময় সম্পর্ক হয়ে পড়তে পারে নিষ্প্রাণ।
আইনি বিচ্ছেদে সমাজের কটু কথার ভয় থাকে, পরিবারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা থাকে। একা হাতে সন্তান পালনও চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নারীর ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা হারানোর ভয়টাও কাজ করে অনেকাংশে। তাই দাম্পত্যের সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করে আইনি সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন অনেকেই।
অনেকে মনে করেন আইনি প্রতিকার মানেই কেবল ডিভোর্স। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। আইনের চোখে প্রতিকারগুলো হলো:
দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার (Restitution of Conjugal Rights): যদি কোনো সঙ্গত কারণ ছাড়াই এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ছেড়ে দূরে থাকে, তবে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মামলা করা যায়।
দেনমোহর ও ভরণপোষণ: সাইলেন্ট ডিভোর্সের ফলে যদি স্ত্রী অবহেলিত হন, তবে তিনি বিবাহ বিচ্ছেদ না করেও ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
সালিশি প্রক্রিয়া: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, যেকোনো বিরোধ মেটাতে স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়রের মাধ্যমে সালিশি বোর্ড গঠনের সুযোগ রয়েছে।
পরকীয়াই হোক বা অন্য কোনো কারণ- আপনার অধিকার এবং করণীয় সম্পর্কে জানতে একজন দক্ষ আইনজীবীর পরামর্শ নিন। কারণ সঠিক সময়ে সঠিক আইনি পরামর্শ আপনার জীবন ও সংসারকে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা থেকে রক্ষা করতে পারে।