স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে!

স্বামী তাকে না জানিয়ে, গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। স্বামীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পুরুষ হিসেবে আমি চারটা বিয়ে করতেই পারি, তোমার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।” তর্ক দীর্ঘায়িত হলে, একমুহূর্তে মেয়েটির হাজারটা সমস্যা আর পাওয়া-না-পাওয়ার গল্প জুড়ে দেন স্বামী। যেন পৃথিবীর সবথেকে বঞ্চিত ব্যক্তিটি তিনি এবং সেটা ঘটেছে মেয়েটিকে বিয়ে করার ফলেই!

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন সবখানে। একই নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। আমার কাছে আসা সমস্যাগুলোর লক্ষণীয় অংশ হলো এই স্বামীর গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে। যদিও, হাজারো নারী জানেন না যে, ধর্মীয় আইনে বহুবিবাহের সুযোগ থাকলেও, আমাদের দেশের আইনে বিবাহের ক্ষেত্রসমূহ এবং প্রথম স্ত্রীর অধিকার স্পষ্টভাবে সুরক্ষিত।

স্বামীর এই গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়, এটি স্ত্রীর প্রতি এক চরম নিষ্ঠুরতা। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আইন কি কোনো প্রতিকার দেয়? গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করার পরিণতি, শাস্তি এবং প্রথম স্ত্রীর অধিকারগুলো কী কী- চলুন, এই স্পর্শকাতর আইনি দিকগুলো পরিষ্কার করে জেনে নেওয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা: গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে, শাস্তি ও স্ত্রীর অধিকার
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, একজন মুসলিম পুরুষ প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না।

আইনের বাধ্যবাধকতা-

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় তিনি আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিসি পরিষদের (ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন) লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না বা এমন অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিয়ে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে না।

(২) ১ উপধারা অনুযায়ী, অনুমতির ও দরখাস্ত নির্ধারিত ফিসসহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দপ্তরে দাখিল করতে হবে ও তাতে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং এই বিবাহের বিষয়ে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ থাকবে।

(৩) ২ উপধারা অনুযায়ী, দরখাস্ত গ্রহণ করার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। ওইরূপ গঠিত সালিসি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত বলে মনে করলে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হতে পারে- এমন সব শর্ত থাকলে প্রার্থিত আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।

(৪) উপধারা অনুযায়ী, দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করার জন্য সালিসি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণাদি লিপিবদ্ধ করবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেকোনো পক্ষ নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নির্দিষ্ট দপ্তরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনা চেয়ে দরখাস্ত দাখিল করতে পারে; তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে ও কোনো আদালতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
সালিসি পরিষদ যে ক্ষেত্রসমূহ বিবেচনায় নিতে পারেন: স্ত্রী যদি বন্ধ্যা হন, শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকেন, দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য শারীরিকভাবে অসমর্থ, দাম্পত্য অধিকার পুনঃস্থাপনের জন্য কোনো ডিক্রিকে ইচ্ছাকৃত পরিহার, স্ত্রীর বাতুলতা বা উন্মত্ততা (মানসিক বিকারগ্রস্থ) ইত্যাদি। স্ত্রীর লিখিত অনুমতি ও অন্যান্য ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রসমূহ প্রয়োজন সাপেক্ষে সালিসি পরিষদ বিবেচনা করবেন।

পরিণতি ও শাস্তি: যদি কোনো ব্যক্তি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করে, ৫ (ক) অনুসারে, বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে। এই টাকা ওইরূপ পরিশোধ না করা হলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে; এবং ৫ (খ) অনুসারে, অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা (দশ হাজার টাকা পর্যন্ত) বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

প্রথম স্ত্রীর বা স্ত্রীদের অধিকার-
তালাকের অধিকার: এই আইন লঙ্ঘনের কারণে প্রথম স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে প্রতিকার চাইতে পারেন।

দেনমোহর ও ভরণপোষণ: দ্বিতীয় বিয়ের কারণে স্ত্রী যদি তালাক চান, তবে তিনি তার সম্পূর্ণ দেনমোহর (যদি পরিশোধিত না থাকে, যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে) এবং ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। সন্তান থাকলে তাদের ভরণপোষণ ও অন্যান্য অধিকার চাইতে পারবেন।

আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। গোপনে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি একটি গুরুতর অপরাধ এবং স্ত্রীর জন্য এটি আইনি প্রতিকারের পথ খুলে দেয়। সঠিক পদক্ষেপ ও আইনি সুরক্ষার জন্য অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top