স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে কি বৈধ? কোন ধর্মের কী অবস্থান?

যদি জানতে পারেন, আপনার স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, আপনি কী করবেন? এই প্রশ্নটি আমার কাছে প্রায়ই আসে। কিছুদিন আগে এমনই এক ভুক্তভোগী মহিলা এসেছিলেন, যার স্বামী তাকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চান নাই। প্রশ্ন করলে, তার স্বামীও নানান বাহানায় এড়িয়ে গেছেন।

তারপর হঠাৎই একদিন তার দ্বিতীয় স্ত্রী স্বয়ং হাজির হলেন। সাথে বিয়ের কাবিননামা ছবি ভিডিও! সে এক হুলুস্থল কাণ্ড। মুহূর্তেই যেন সব শেষ গেল। এগারো বছরের সাজান সংসার, ছোটছোট দু’টো বাচ্চা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে জবাবদিহিতা! অবুঝ দুটো বাচ্চা নিয়ে তিনি অথৈ সাগরে পড়ে গেলেন।

তিনি আমাকে বললেন, “অ্যাডভোকেট সাহেব, আমি এখন কী করব? তাকে মাফ করে দেব? এমন একজন বিশ্বাসঘাতকের সাথে সংসারই বা কিভাবে করব? অন্যদিকে আমার বাচ্চাদের ভবিষ্যতই বা কি হবে? নাকি তালাক দেব, মামলা করব?” তার চোখে ছিল একই সাথে ভয়, ঘৃণা আর হতাশা।

তার কষ্ট আমাকে মনে করিয়ে দিল, আমাদের সমাজে এমন কত অসহায় নারী আছেন, যারা এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েও কিছু করার সাহস পান না। তারা মনে করেন, তাদের আর কোনো পথ খোলা নেই। যদিও একথা স্পষ্ট যে, মুসলিম আইন পুরুষকে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছে। তবে তা হতে হবে, নির্দিষ্ট অবস্থার প্রেক্ষিতে, সুনির্দিষ্ট বিধান মেনেই।

আমাদের সমাজে অনেকেরই ধারণা আছে যে, মুসলিম পুরুষের একাধিক বিয়ে করার অধিকার আছে, তাই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না থাকলে এবং ইচ্ছে হলেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের আইন এই ধারণাকে সমর্থন করে না। বরং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক নারীই তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে আপনার করণীয়-
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, কোনো মুসলিম পুরুষ সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমতি এবং প্রথম স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না। যদি কোনো স্বামী এই আইন অমান্য করে বিয়ে করেন, তবে এর কিছু আইনগত পরিণতি রয়েছে।

মামলা দায়ের: প্রথম স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে নিম্নলিখিত আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন:

স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের অধীনে মামলা দায়ের করতে পারেন। এই অপরাধের জন্য স্বামীর এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

তালাক: স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে তালাকের জন্য আবেদন করতে পারেন। তালাকের পর স্ত্রী তার বকেয়া বা সম্পূর্ণ দেনমোহর আদায় করতে পারেন।

ভরণপোষণ: দ্বিতীয় বিয়ের পরও যদি স্বামী প্রথম স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন, তবে স্ত্রী ভরণপোষণ আদায়ের জন্য মামলা করতে পারেন। এমনকি, স্ত্রী পৃথক বসবাস করেও স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ আদায় করার অধিকার রাখে।

মনে রাখবেন, স্বামীর এই ধরনের বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে আপনার আইনগত অধিকার রয়েছে। আপনার নীরবতা শুধু আপনার প্রতিই অন্যায় নয় বরং এটি আপনার ভবিষ্যৎ জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলবে।

তবে, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে রাষ্ট্রের আইনে বেআইনি হলেও বিয়ে বৈধ অর্থাৎ স্বীকৃত বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে। যার কিছু সুস্পষ্ট শর্তও রয়েছে। যেমন, সকল স্ত্রীর মধ্যে আর্থিক ও সামাজিক সমতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক, ইত্যাদি।

হিন্দু ধর্মে আদর্শগতভাবে ‘একপত্নী ব্রত’ বা একজন স্ত্রী থাকাকেই শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। তবে, ধর্মীয় অবস্থানগত দিক থেকে, প্রাচীন শাস্ত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে একাধিক বিয়ের কথা থাকলেও আধুনিক যুগে এটি নিরুৎসাহিত।

আইনি অবস্থান: বাংলাদেশের প্রচলিত হিন্দু আইনে পুরুষের একাধিক বিয়ের ওপর সরাসরি কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা বা নির্দিষ্ট সীমা নেই। তবে ভারতে হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ অনুযায়ী হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখদের জন্য বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।

খ্রিস্টধর্মে বহুবিবাহ বা দ্বিতীয় বিয়ে (প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায়) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। খ্রিস্টান বিয়েতে ‘এক স্বামী ও এক স্ত্রী’ নীতি অনুসরণ করা হয় এবং এটি আমৃত্যু অবিচ্ছেদ্য বন্ধন হিসেবে বিবেচিত। আর বৌদ্ধ ধর্মেও সাধারণত একপত্নী বিবাহ প্রথা প্রচলিত। ধর্মীয়ভাবে বহুবিবাহের কোনো সমর্থন নেই এবং এটি সামাজিক ও নৈতিকভাবে অনুচিত মনে করা হয়। আপনার করণীয়
১. আইনি পরামর্শ: এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
২. প্রমাণ সংগ্রহ: আপনার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের প্রমাণ সংগ্রহ করুন, যেমন – কাবিননামা, ছবি বা অন্যান্য কাগজপত্র।
৩. আইনি পদক্ষেপ: আপনার আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top