এক অসহায় গৃহবধূ, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির অসহনীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাধ্য হয়ে বাপের বাড়ি চলে এসেছেন। তিনি বিচ্ছেদ চাইছেন না। সন্তান ও সমাজের কথা ভেবে তিনি সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দু’দিন আগে আমার কাছে আসা একটি মেসেজের কথা বলছি আপনাদের।
স্বামী তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন: “যখন তুমি আমার সঙ্গে থাকছো না, তখন তোমাকে আর এক পয়সাও ভরণপোষণ দেবো না।” স্বামীর এই কথায় মেয়েটির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
একদিকে স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে তিনি আলাদা থাকতে বাধ্য হয়েছেন, অন্যদিকে, তার জীবনধারণের জন্য স্বামীর আর্থিক সাহায্য অপরিহার্য। সমাজের চোখে, তিনি স্বেচ্ছায় স্বামীকে ছেড়ে এসেছেন, কিন্তু তার সেই দূরে থাকার পেছনে ছিল এক কঠিন ‘যুক্তিযুক্ত কারণ’।
এই পরিস্থিতিতে, বিচ্ছেদ না ঘটিয়েও একজন স্ত্রী কি তার স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন? নাকি স্বামীর ঘর ছেড়ে গেলেই সেই অধিকার বাতিল হয়ে যায়?
সমাজের বহু নির্যাতিতা নারী আজও জানেন না যে, তাদের নিরাপত্তার জন্য দূরে থাকা মানেই স্বামীর আর্থিক দায় থেকে মুক্তি নয়। আইন এখানে স্ত্রীকে কীভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে? চলুন, এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি সত্যটি জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: যুক্তিসঙ্গত কারণে আলাদা বসবাস ও ভরণপোষণ
বিবাহ বিচ্ছেদ না হলেও একজন স্ত্রী যুক্তিসঙ্গত কারণে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা বসবাস করলে, তিনি ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার হারান না। এই অধিকারটি বাংলাদেশের আইনে সুপ্রতিষ্ঠিত:
আইনে স্ত্রীর অধিকার: মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, যদি স্বামীর এমন কোনো ত্রুটি বা আচরণ থাকে যার কারণে স্ত্রীর পক্ষে তার সঙ্গে থাকা অসম্ভব বা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তবে স্ত্রী আলাদা থাকতে পারেন এবং স্বামীর কাছে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
আরও কারণগুলো হলো, স্বামী যদি স্ত্রীকে তাৎক্ষণিক দেনমোহর পরিশোধ না করেন (মোহরে মুয়াজ্জল- এর ক্ষেত্রে), যদি অভ্যাসগতভাবে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করেন, দ্বিতীয় বিয়ে করেন, কুষ্ঠ বা অন্য কোনো ছোঁয়াচে ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন, দীর্ঘকাল স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী দূরে থাকেন; ইত্যাদি।
আইনের মূলনীতি: যখন স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও অন্যায়ভাবে দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করেন, তখনই কেবল ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার বাতিল হতে পারে। কিন্তু যদি তার আলাদা থাকার পেছনে স্বামীর আচরণ বা পরিবেশের কারণে একটি ‘যুক্তিযুক্ত কারণ’ থাকে, তবে বিবাহ বন্ধন বজায় থাকা পর্যন্ত স্বামী ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
আপনার করণীয়-
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও আইনি পদক্ষেপও ভিন্ন হবে। ‘যুক্তিযুক্ত কারণ’ আদালতে প্রমাণের ওপর নির্ভর করে। আপনার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার সঠিক আইনি সমাধান পেতে, কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।