দেনমোহর পরিশোধের একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছেন এক দম্পতি! তাদের বিয়ের দিনই স্বামী তার স্ত্রীকে স্বর্ণালংকার দিয়ে দেনমোহর পরিশোধ করে দেন। স্ত্রী সেই স্বর্ণ বুঝেও নেন এবং এটি দেনমোহর হিসেবে পরিশোধ হয়েছে বলেও স্বীকার করে নেন। কিন্তু সমস্যা হলো, নিরাপত্তার কারণে সেই স্বর্ণালংকারগুলো স্ত্রী নিজের কাছে না রেখে স্বামীর সিন্দুকেই রেখে দেন।
কয়েক বছর পর তাদের বিচ্ছেদ হলো। স্ত্রী দাবি করলেন, খাতাকলমে তার দেনমোহর পরিশোধ হলেও বাস্তবে তা অপরিশোধিত-ই রয়ে গেছে! স্বামী প্রমাণ হিসেবে স্বর্ণ কেনার রসিদ দেখালেন। স্ত্রী বললেন, “স্বর্ণ তাকে দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেগুলো তো এতদিন স্বামীর দখলেই ছিল, সে তো তার স্ত্রীধন হয়ে ওঠেনি এবং তা অদ্যবধি বুঝেও পাননি।”
পরিস্থিতি আরও জটিল হলো, কারণ যেদিন স্বর্ণ কেনা হয়েছিল, তার তুলনায় এখন স্বর্ণের দাম কয়েক গুণ! এখন স্ত্রী যদি স্বর্ণের বদলে অর্থ দাবি করেন, তবে তিনি কি আজকের বাজারমূল্য অনুযায়ী দাম পাবেন?
এই ঘটনাটি আমাদের বহু দম্পতির মনে তৈরি হওয়া ভুল ধারণার দিকে আঙুল তোলে- দেনমোহর পরিশোধের পর সেই সম্পদ স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর এবং তার ব্যক্তিগত মালিকানা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। এই পরিস্থিতিতে স্বামীর কাছে থাকা সেই স্বর্ণের মালিকানা কার এবং মূল্য নির্ধারণের আইনি ভিত্তি কী? চলুন, এই বিষয়ে আইন কী বলছে, তা জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: দেনমোহর, স্ত্রীধন ও মূল্য নির্ধারণ
দেনমোহর একবার পরিশোধ হয়ে গেলে, তা স্ত্রীর ‘স্ত্রীধন’ (স্ত্রীর বা নারীর নিজস্ব সম্পত্তি) হিসেবে গণ্য হয়। এই স্ত্রীধনের ওপর স্ত্রীর পূর্ণ মালিকানা জন্মায়।
স্ত্রীধন ও দেনমোহর পরিশোধ: যদি দেনমোহর স্বর্ণালংকার দিয়ে পরিশোধ করা হয় এবং স্ত্রী তা গ্রহণ করেন, তবে আইনত দেনমোহর পরিশোধ হয়ে যায়। স্বর্ণটি তখন স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা স্ত্রীধনে পরিণত হয়।
স্বামীর কাছে রাখা: স্ত্রী যদি তার ব্যক্তিগত স্ত্রীধন নিরাপত্তার জন্য স্বামীর কাছে রাখেন, তবুও এর আইনি মালিকানা স্ত্রীরই থাকে। স্বামী এখানে কেবল স্ত্রীর সম্পদের ‘আমানতকারী’ বা ‘ট্রাস্টি’ হিসেবে কাজ করেন। তালাকের পর স্ত্রীকে তা অবশ্যই ফেরত দিতে হবে।
স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ: যদি স্ত্রী স্বর্ণ ফেরত না চেয়ে তার অর্থ মূল্য দাবি করেন এবং স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়, তবে সাধারণত আদালত তালাকের তারিখ বা দাবির তারিখের বাজারমূল্য অনুযায়ী দেনমোহর বা স্ত্রীধনের মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন, যাতে স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত হয়। এই ক্ষেত্রে দেনমোহর পরিশোধের সময়টির মূল্য আর প্রযোজ্য হয় না। এই প্রক্রিয়া নিয়ে বির্তক থাকলেও, এভাবেই হয়ে আসছে।
আপনার জন্য পরামর্শ:
স্বর্ণ যখন দেনমোহর হিসেবে পরিশোধ করা হয়, তখন তা লিখিতভাবে কাবিননামায় এবং সম্ভব হলে পৃথক রসিদে উল্লেখ করা উচিত। দেনমোহর পরিশোধের পর সেই সম্পত্তি অবশ্যই স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত (স্বামীর হেফাজতে থাকার পরও)। এই ধরনের জটিলতা এড়াতে এবং সঠিক আইনি প্রতিকার পেতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।