সন্তানের ভরণপোষণ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা । অনেক নারীই বুঝতে পারেন না যে তারা ঠিক কত টাকা দাবি করতে পারেন, আবার অনেক স্বামী মনে করেন নিজের ইচ্ছামতো সামান্য কিছু টাকা দিলেই বোধহয় দায়িত্ব শেষ। চলুন এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
মিসেস সালেহা বেগমের স্বামী কথাই ধরা যাক। সংক্ষেপে বলছি, তার স্বামী একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বড় পদে চাকরি করেন। স্বাভাবিক ভাবেই তার আয় রোজগার বেশ ভালোই ছিল। অথচ ডিভোর্স মামলার পর তিনি সালেহা বেগমকে দুই সন্তানের খরচের জন্য মাসে মাত্র ৫ হাজার টাকা পাঠাতে চাইলেন।
তিনি অত্যন্ত যুক্তিহীন ভাবে বলে বসলেন, “আমি এর বেশি দিতে পারবো না, এটাই আমার সিদ্ধান্ত।” এদিকে সালেহা বেগম বুঝতে পারছিলেন না, তার স্বামীর কয়েক লাখ টাকা বেতনের বিপরীতে এই সামান্য ৫ হাজার টাকা কি আইনত মেনে নেওয়া যায় কি না?
আমাদের সমাজে এমন অনেক সালেহা বেগম আছেন যারা জানেনই না যে, ভরণপোষণের অংক নির্ধারণের চাবিকাঠি আসলে কার হাতে।
আইনগত ব্যাখ্যা: অংকটা কে এবং কীভাবে ঠিক করে?
১. স্বামী নন, শেষ কথা বলবে আদালত: ভরণপোষণের পরিমাণ স্বামী তার নিজের খেয়ালখুশিমতো নির্ধারণ করতে পারেন না। এ ব্যাপারে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যে যদি পারস্পরিক আলোচনার মাধমে ঠিক হয় তো ভালো। আর যদি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে পারিবারিক আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন যে মাসিক কত টাকা দিতে হবে।
২. নির্ধারণের মূল ভিত্তি কী? আদালত কেবল একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং কয়েকটি দিক বিবেচনা করে:
স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য: স্বামীর মাসিক আয়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং সামাজিক অবস্থান, ইত্যাদি।
স্ত্রীর প্রয়োজনীয়তা: স্ত্রীর জীবনযাত্রার মান এবং তিনি আগে যেভাবে থাকতে অভ্যস্ত ছিলেন, সেই মান বজায় রাখার নূন্যতম খরচ।
সন্তানের চাহিদা: সন্তানের বয়স, শিক্ষার খরচ (স্কুল ফি, কোচিং) এবং চিকিৎসা ব্যয়, ইত্যাদি।
৩. জীবনযাত্রার মান (Status): উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বামী যদি বিলাসী জীবন যাপন করেন, তবে স্ত্রী ও সন্তানকেও সেই মান অনুযায়ী ভরণপোষণ দিতে হবে। স্বামী ৫ তারকা হোটেলে খাবেন আর স্ত্রী-সন্তান ডাল-ভাতে দিন কাটাবে, আইন এটি সমর্থন করে না।
৪. পরিবর্তনশীলতা: একবার ভরণপোষণের অংক নির্ধারণ হয়ে গেলে কি তা আর বদলানো যায় না? অবশ্যই যায়। যদি স্বামীর আয় বাড়ে কিংবা সন্তানের পড়ালেখার খরচ বেড়ে যায়, তবে পুনরায় আদালতের কাছে আবেদন করে ভরণপোষণের অংক বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে।
মনে রাখবেন: আদালতে স্বামীর আয় লুকানোর চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয় না। বর্তমান ডিজিটাল যুগে এবং উচ্চ আদালতের কঠোর অবস্থানে স্বামীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা খুঁজে বের করার বিভিন্ন আইনি পথ রয়েছে। আর স্বামী যদি উল্টো পথে হাঁটেন, তবে তার বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না!
আপনার জন্য পরামর্শ: প্রতিটি মামলার প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। আইনকানুনগুলো একই হলেও উপস্থাপনের ধরনে ফলের ভিন্নতা আসে। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। উপরোক্ত আলোচনায় কেবল সাধারণ প্রতিকারগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।