বিয়ের সময় ১০১ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করেছিলেন! এখন কি চাইলেও তা বাড়িয়ে সম্মাজনক পর্যায়ে আনা সম্ভব?
বছর দশেক আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন আরিফ ও নিনা। শত চেষ্টা করেও পরিবারকে তার বিয়েতে রাজি করাতে পারেনি নিনা। পরিবারের অমতে বিয়ে হওয়ায় জেদ করে কাবিননামায় দেনমোহর লিখেছিলেন মাত্র ১০১ টাকা। পরিবারকে দেখাতে চেয়েছিল, তার বিশ্বাস আর ভরসার জায়গা!
আজ তারা সুখে সংসার করছেন, আরিফ এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। নিনার সেই আবেগের বয়স শেষ হয়েছে। চারিদিকের কঠিন বাস্তবতার গল্পগুলো তার মধ্যে আশঙ্কার ডানা বাঁধে মাঝে মধ্যে। নিনা প্রায়ই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন- যদি কোনোদিন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে, তবে এই দেনমোহরের ‘১০১ টাকা’ কি তাকে ন্যূনতম সুরক্ষা দেবে?
ওদিকে আরিফ নিজেও উপলব্ধি করছেন, অতি আবেগের বসে এতো কম দেনমোহর নির্ধারণ করা ঠিক হয়নি। তিনিও চান দেনমোহর বাড়িয়ে নিনার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে, ধর্মীয় বিধান মত চলতে। কিন্তু তারা দ্বিধায় আছেন- কাবিন হয়ে যাওয়ার পর কি আদৌ দেনমোহর বাড়ানো যায়?
আসুন জেনে নেয়া যাক, অযৌক্তিকভাবে কম দেনমোহর চ্যালেঞ্জ ও এটি বাড়ানোর আইনি সুযোগ।
আইনগত ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
অযৌক্তিক দেনমোহর চ্যালেঞ্জ: আমাদের সমাজে কোথাও কোথাও এখনো ‘টোকেন’ দেনমোহরের প্রচলন আছে। মাঝে মধ্যে এমন কিছু নিউজও চোখে পড়ে। তবে আইনের ভাষায়, দেনমোহর অবশ্যই স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা এবং স্বামীর আর্থিক সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যদি বিয়ের সময় নামমাত্র দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়, তবে স্ত্রী আদালতের আশ্রয় নিয়ে ‘মোহর-ই-মিসল’ (Proper Dower) দাবি করতে পারেন।
তাহলে কি বিয়ের পরও দেনমোহর বাড়ানো যায়?
হ্যাঁ, উভয় পক্ষ রাজি থাকলে কি বাড়ানো যায়; এটি সম্ভব এবং আইনত বৈধ। মুসলিম আইন অনুযায়ী, বিয়ের পর যেকোনো সময় স্বামী তার স্ত্রীর দেনমোহর বৃদ্ধি করতে পারেন। এর জন্য নতুন করে বিয়ের প্রয়োজন নেই।
স্বামী একটি সম্পূরক দলিল বা ‘দেনমোহর বৃদ্ধির ঘোষণাপত্র’ (Registration of Enhancement of Dower) সম্পন্ন করে এটি কার্যকর করতে হবে এবং তা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর (যেমন: নিকাহ রেজিস্ট্রার) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরবর্তীতে বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যু হলে এই বর্ধিত অংশই স্ত্রীর পাওনা হিসেবে গণ্য হবে।
আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি: বাংলাদেশের আদালতগুলো দেনমোহরকে কেবল একটি চুক্তি হিসেবে দেখে না, বরং এটি নারীর একটি ‘আইনি সুরক্ষা কবচ’। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, দেনমোহর একটি আবশ্যকীয় দায়। এছাড়া মুসলিম আইনের মূলনীতি অনুসারে, স্বামী তার জীবদ্দশায় যেকোনো সময় স্ত্রীর সম্মতিতে দেনমোহরের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারেন, যা মূল কাবিননামার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয়।
সুতরাং মনে রাখবেন, অধিকার আদায়ের পথ সবসময় খোলা থাকে। পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেও অধিকার সুসংহত করার সুযোগ, আইন করে দিয়েছে। সচেতন হোন, কারণ আপনার অধিকার আপনার সম্মান।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখবেন, দেনমোহর যেহেতু পুরোটাই পরিশোধ করার বিষয়, শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বেশি পরিমাণ মোহর ধরা যাবে না। আর যদি সেভাবে নির্ধারণ করা হয়, তবে সেই মোহরানা পুরোটাই স্ত্রীর প্রাপ্য এবং তা পুরোপুরিই স্ত্রীকে প্রদান করতে হবে। অন্যদিকে, অতিরঞ্জিত ভালোবাসার প্রকাশে নামমাত্র দেনমোহর নির্ধারণ থেকে বিরত থাকুন।
আরও একটি তথ্য এক্ষেত্রে বলা উচিত, অনেকে ছলে-বলে-কৌশলে স্ত্রীকে দেনমোহর থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেন। বহুকাল থেকে নানান কায়দা-কানুন করে বাসর রাতে ‘দেনমোহর মাফ’ করিয়ে নেওয়ার অপসংস্কৃতি চালু রয়েছে আমাদের সমাজে, যা কোন দিকে দিয়েই ইসলাম সমর্থন করে না।
‘যে স্বামীর মনে স্ত্রীর দেনমোহর আদায়ের ইচ্ছাটুকুও নেই, হাদিস শরিফে তাকে বলা হয়েছে ‘ব্যভিচারী’।’ এই রেফারেন্সটুকু ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৪/৫২২-৫২৩)।