গত সপ্তাহের কথা। একজন ভদ্রমহিলার সাথে কথা হচ্ছিল। তার কথার সারমর্মটুকু হলো, তিনি দেশের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তার অভিযোগ ছিল, স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং শারীরিকভাবে তাকে নির্যাতন করেন। যখন তিনি বিচ্ছেদের কথা তুললেন, তখন তার চারপাশের মানুষ তাকে বলতে শুরু করলো, “মেয়েরা তো আর স্বামীকে তালাক দিতে পারে না, এ কেবল পুরুষের অধিকার।”
তিনি দ্বিধায় পড়ে গেলেন, আসলেই কি একজন স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দেওয়ার আইনগত ক্ষমতা রাখেন না?
এদেশের অধিকাংশ মানুষও বিভ্রান্ত নারীর তালাকের অধিকার নিয়ে। নারীর কি তালাকের কোন অধিকার নেই? এই প্রশ্নটা প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারী আমাকেও করছেন। আমাদের সমাজেও এ সম্পর্কে অনেক প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। আসুন বিস্তারিত জানা যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: নারীর তালাকের অধিকার
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একজন মুসলিম নারী প্রধানত ৩টি উপায়ে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন:
১. তালাক-ই-তাফওয়ীজ (Talak-e-Tafwiz) (কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম)
অধিকাংশ মানুষই জানেন না যে, নিকাহনামা বা কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করেন, তবে সেই ক্ষমতা বলে একজন স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করে স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। এর জন্য তাকে আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয় না। সাধারণ তালাকের মতোই কাজী অফিসে গিয়ে তিনি বিচ্ছেদ সম্পন্ন করতে পারেন।
২. খুলা তালাক বা খোলা তালাক (Khula) (পারস্পরিক সমঝোতা)
যদি কাবিননামায় ক্ষমতা দেওয়া না থাকে, তবে স্ত্রী স্বামীর সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিচ্ছেদে আসতে পারেন। এক্ষেত্রে স্ত্রী সাধারণত দেনমোহরের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ দাবি ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ গ্রহণ করেন। দেনমোহর পরিশোধিত থাকলে, স্বামীর দাবীর প্রেক্ষিতে স্ত্রী অর্থ বা সম্পত্তি প্রদান করবেন।
মোট কথা, খোলা তালাক হলো, কোন কিছুর বিনিময়ে, স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক প্রদানে সম্মত করবেন বা স্বামীর কাছ থেকে তালাক গ্রহণ করবেন।
৩. আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ (১৯৩৯ সালের আইন)
যদি ১৮ নম্বর ঘরে ক্ষমতা না থাকে এবং স্বামী যদি তালাক প্রদান করতে রাজি না হয় অথবা খোলা তালাকের মাধ্যমেও বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করা না যায়, তবে ১৯৩৯ সালের ‘মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন’ অনুযায়ী একজন স্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।
সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ যেমন: স্বামীর ৪ বছর নিখোঁজ থাকা, ২ বছর ভরণপোষণ না দেওয়া, ৭ বছরের বেশি কারাদণ্ড হওয়া অথবা স্বামীর নিষ্ঠুরতা, দুরারোগ্য ব্যাধি ইত্যাদি কারণে স্ত্রী মামলা করে বিচ্ছেদ পেতে পারেন।
মনে রাখবেন, বিবাহ বিচ্ছেদ মানেই অধিকার হারানো নয়। একজন স্ত্রী তালাক দিলেও তার পাওনা দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন খোরপোশ পাওয়ার অধিকার সাধারণত হারান না (যদি না তিনি নিজে খুলা তালাকের মাধ্যমে তা মওকুফ করেন)।
নারীর তালাকের অধিকার প্রসঙ্গে যে কথা না জানলে আপনার জানা সম্পূর্ণ হবে না- মুসলিম ধর্মীয় বিধানে নারীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। শুধু স্বামীকে প্রদান করা হয়েছে। স্বামী যদি প্রাপ্ত সেই ক্ষমতাটা স্ত্রীকে প্রদান করেন, তবেই স্ত্রী তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্জন করেন। এ প্রসঙ্গে কোন প্রশ্ন থাকলে, কমেন্টে বা হোয়াটসঅ্যাপে জানাতে পারেন।
আপনার জন্য পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও সমাধানও ভিন্ন হবে। সঠিক আইনি পদক্ষেপের জন্য একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করা জরুরি।