বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে, সন্তান কার কাছে থাকবে? তাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব কার?

“আমার বাচ্চা তো ওর মায়ের জেদের কারণে আমার সাথে থাকে না, তাহলে আমি কেন ওর খরচ দেব? আগে বাচ্চা আমার কাছে আসুক, তারপর দেখা যাবে।” বেশ জোড়ের সাথেই কথাগুলো বলছিলেন এক বাবা। বেশ কিছুদিন হলো, তাদের তালাক হয়ে গেছে।

তালাকের পর তার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান মায়ের কাছেই বড় হচ্ছে। ভদ্রলোক মনে করছেন, যেহেতু তিনি সন্তানের প্রতিদিনের সান্নিধ্য পাচ্ছেন না, তাই তার কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতাও নেই। এমন ধারণা পোষণ করেন অনেকেই। সন্তান মায়ের কাছে থাকলেই কি বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?

বাস্তবতা হলো, সেই ভদ্রলোকের মতো অনেক বাবাই জানেন না যে, আইন ও সন্তানের অধিকারের জায়গাটি কতটা কঠোর, বাস্তবিক এবং অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত। চলুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা ও প্রকৃত সত্য:

১. তালাকের পর দায়িত্ব: মা ও বাবার বিচ্ছেদ হলেও সন্তানের সাথে বাবার রক্তের সম্পর্ক শেষ হয় না। সন্তান যেখানেই থাকুক- মায়ের কাছে কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়ের কাছে- বাবার আর্থিক দায়িত্ব (খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসা) অপরিবর্তিত এবং চলমান থাকবে।

২. কত বছর বয়স পর্যন্ত দিতে হয়?

পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে: সাধারণত ১৮ বছর (সাবালক হওয়া) পর্যন্ত বাবা ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। তবে সন্তান যদি শারীরিকভাবে অক্ষম বা অসুস্থ হয়, তবে এই সময়সীমা আরও বাড়তে পারে।

কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মেয়েরা বিয়ের আগ পর্যন্ত বাবার কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী। এমনকি মেয়ে যদি তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা হয়ে বাবার ঘরে ফিরে আসেন, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে বাবা পুনরায় ভরণপোষণ দিতে বাধ্য হতে পারেন।

৩. মায়ের দায়িত্ব কী? মুসলিম আইন অনুযায়ী, সন্তানের ভরণপোষণের একক দায়িত্ব বাবার। মায়ের যদি অগাধ সম্পত্তিও থাকে, তবুও তিনি সন্তানকে খাওয়ানোর খরচ দিতে আইনত বাধ্য নন; এটি একান্তই বাবার কর্তব্য। মা কেবল সন্তানের জিম্মাদার (Custody) হিসেবে সেবা প্রদান করেন।

৪. জিম্মাদারি বনাম ভরণপোষণ: বাচ্চার জিম্মাদারি (কে রাখবে) এবং ভরণপোষণ (কে খরচ দেবে)- এই দুটি আলাদা বিষয়। বাবার কাছে বাচ্চা নেই বলে তিনি খরচ দেবেন না- আদালতে এই যুক্তি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রতিকারগুলো কী কী: যদি কোনো বাবা সন্তানের খরচ দিতে অস্বীকার করেন, তবে মা বা বাচ্চার সেই সময়ের জিম্মাদার পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে মাসিক খোরপোশ আদায়ের মামলা করতে পারেন। আদালত বাবার আয় ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে একটি নির্দিষ্ট অংক নির্ধারণ করে দেবেন।

এছাড়াও, জেলা লিগ্যাল এইডে আবেদন করবেন। লিগ্যাল এইড উভয় পক্ষকে ডেকে তাদের কথা শুনবে এবং সমাধান দিবেন। যদি সেই সমাধানে কোন পক্ষ রাজী না থাকেন, তবেই আদালতে যাবার প্রশ্ন উপবে। আরও একটা তথ্য, লিগ্যাল এইডে আবেদন করতে কোন টাকা পয়সা লাগে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top