পারিবারিক আদালতের করিডোরে একটি প্রশ্ন আমি প্রায়ই শুনি- “অল্প বয়সে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, জীবন বাকি পড়ে আছে অনেকটা। কিন্তু আবার বিয়ে করলে কি সন্তানকে কেড়ে নেওয়া হবে?” এই একটি ভয় বাংলাদেশের অনেক মা-বাবাকে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাধা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
গতকাল এক অসহায় মা প্রশ্নটি করেছেন মেসেজ দিয়ে। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে মাত্র সাতাশ বছর বয়সে। এরপর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়িতে থাকছেন। জীবন গুছিয়ে নিতে তিনি পুনরায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এটা জানতে পেরে বাচ্চার বাবা মামলা করে বসলেন, “মা যেহেতু নতুন করে বিয়ে করেছেন, তাই সন্তান আর মায়ের কাছে নিরাপদ নয়।”
বাংলাদেশের হাজারো মায়ের জন্য এই কষ্ট ইদানিং অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু আইন কি আসলেই এতটা কঠোর? আসুন আসল সত্যটুকু জেনে নেয়া যাক। আইনগত ব্যাখ্যা: বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ‘গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০’ অনুযায়ী, মা যদি এমন কাউকে বিয়ে করেন যিনি সন্তানের নিষিদ্ধ স্তরের (Prohibited degree) আত্মীয় নন, তবে মা সাধারণত জিম্মাদারী হারান। কিন্তু, এটি কোনো ধ্রুব সত্য নয়। অর্থাৎ ঝুঁকি থাকে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নয়।
বাংলাদেশে সন্তানের কাস্টডি নির্ধারণে আদালত মূলত দেখে সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ (Welfare of the child)।
আদালত দেখেন:
১. দ্বিতীয় বিয়ের পর সন্তানটি সৎ মা বা সৎ বাবার কাছে কতটুকু নিরাপদ।
২. মা বা বাবার দ্বিতীয় বিয়ে সন্তানের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে কোনো বাধা সৃষ্টি করছে কি না।
৩. যদি দেখা যায় দ্বিতীয় বিয়ের পরও মা-ই সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, তবে আইনত মা-ই সন্তানের জিম্মা বা কাস্টডি পেতে পারেন।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, মা যদি দ্বিতীয় বিয়েও করেন এবং সেই বিয়েটি যদি সন্তানের কল্যাণের পরিপন্থী না হয়, তবে কেবল বিয়ের অজুহাতে মাকে তার সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। আদালত সবসময়ই মুদ্রিত আইনের চেয়ে শিশুর কল্যাণকে বড় করে দেখেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিয়ে নয় বরং সন্তানের নিরাপত্তা, যত্ন ও মানসিক সুস্থতা, এই তিনটাই আদালতের মূল বিবেচ্য।
আপনার জন্য পরামর্শ: প্রতিটি মামলার প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। আইনকানুনগুলো একই হলেও উপস্থাপনের ধরনে ফলের ভিন্নতা আসে। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখবেন, সঠিক উপস্থাপনার অভাবে অনেক সময় সত্য ঘটনাও আদালতের কাছে গুরুত্ব হারায়।