স্ত্রী কখন আলাদা থেকেও স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পেতে পারেন?

স্বামী তার স্ত্রীকে ফেরানোর জন্য ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’-এর মামলা করেছেন। স্ত্রীর অপরাধ কী? তিনি স্বামীর গালিগালাজ, নির্যাতন আর সন্দেহের অত্যাচারে টিকতে না পেরে বাবার বাড়ি চলে গেছেন। আদালতে স্বামী দাবি করছেন- “স্ত্রীর ফিরে না আসার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।”

সংসার ছেড়ে আলাদা থাকলেই কি মামলা করা যায়? আইন কিন্তু ‘ইচ্ছামতো’ আলাদা থাকাকে সমর্থন করে না, আবার ‘অসহায়ত্ব’কেও অগ্রাহ্য করে না।

এখানেই মূল সংকট। অনেক স্বামী মনে করেন স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিলেই তাকে শাসনের নামে শারীরিক মানসিক নির্যাতন করার অধিকার জন্মে। আবার অনেক স্ত্রী মনে করেন তুচ্ছ কারণেও আলাদা থাকা যায়। ‘যৌক্তিক কারণ’ শব্দটির অপব্যাখ্যায় অনেক সংসার অকালেই ভেঙে যায়।

আইনগত ব্যাখ্যা: পারিবারিক আইন অনুযায়ী, একজন স্বামী বা স্ত্রী তখনই এই মামলা করতে পারেন যদি অপর পক্ষ “যৌক্তিক কারণ ছাড়া” (Without Reasonable Excuse) আলাদা থাকেন। আদালত কোন কোন কারণগুলোকে ‘যৌক্তিক কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা গ্রহণ করতে পারেন-

১. শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন: যদি প্রমাণিত হয় যে একসাথে থাকলে বিবাদীর জীবনের ঝুঁকি আছে বা তিনি নিয়মিত নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছেন। ধারাবাহিকভাবে স্ত্রীর প্রতি এমন আচরণ চলতে থাকে।

২. অসচ্চরিত্র বা সন্দেহ: স্বামী যদি স্ত্রীকে ভিত্তিহীন অপবাদ দেন। তবে আলাদা থাকা আইনত বৈধ। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে, স্বামীর পরকীয়া। স্ত্রী যদি স্বামীকে সংশোধনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, এবং স্বামী পরকীয়ায় লিপ্ত থাকেন, তবে স্ত্রীর আলাদা থাকার অধিকার জন্মে।

৩. দেনমোহর ও খোরপোশ: স্ত্রী যদি তার তলবি দেনমোহর (Prompt Dower) না পান, তবে তিনি স্বামীর সাথে বসবাস করতে আইনত অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।

৪. স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে: এটি বর্তমান সময়ে একটি নিয়মিত দৃশ্য। স্বামী গোপনে পরকীয়া করে বিয়েও করে ফেলেছেন। এমন ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বা যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রী আলাদা থাকার অধিকার রাখেন; ইত্যাদি।

এবং উপরোক্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবেন। এটা তার আইনি অধিকার।

এখন দেখা যাক, কোন পরিস্থিতিতে একজন স্বামী আলাদা থাকার কারণে স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করতে পারেন:

১. স্ত্রীর অবাধ্যতা: যদি স্ত্রী কোনো যৌক্তিক কারণ (যেমন: নির্যাতন বা পরকীয়া) ছাড়াই স্বামীর ঘর ত্যাগ করেন এবং স্বামী বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সংসারে ফিরতে অস্বীকার করেন, এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে আইনত বাধ্য নন।

২. দাম্পত্য অধিকার পালনে অস্বীকৃতি: যদি স্ত্রী কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণ ছাড়াই স্বামীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক (Consummation of marriage) স্থাপনে অস্বীকৃতি জানান, তবে স্বামী সেটিকে আলাদা থাকার এবং ভরণপোষণ বন্ধ করার ভিত্তি হিসেবে গণ্য করতে পারেন।

৩. স্ত্রীর অসচ্চরিত্র বা পরকীয়া: যদি এটি প্রমাণিত হয় যে স্ত্রী অন্য কোনো পুরুষের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত বা অনৈতিক জীবনযাপন করছেন, তবে স্বামী আলাদা থাকার এবং ভরণপোষণ না দেওয়ার আইনি অধিকার রাখেন। এটি স্বামীর জন্য মানসিক নিষ্ঠুরতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

৪. বিনা অনুমতিতে গৃহত্যাগ: যদি স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে পিত্রালয় বা অন্য কোথাও অবস্থান করেন এবং স্বামীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন (যদি স্বামী তাকে কোনো প্রকার নির্যাতন না করে থাকেন), তবে স্বামী আলাদা থাকতে পারেন।

৫. স্বামীর প্রতি নিষ্ঠুরতা: মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন কেবল স্ত্রীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। যদি স্ত্রী নিয়মিতভাবে স্বামী বা স্বামীর পরিবারের সদস্যদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন, গালিগালাজ করেন বা মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেন, তবে স্বামী আত্মরক্ষার্থে আলাদা থাকতে পারেন।

৬. তলবি দেনমোহর পরিশোধের পর অবাধ্যতা: যদি স্বামী স্ত্রীর তলবি দেনমোহর (Prompt Dower) পরিশোধ করে দেন, এরপরও স্ত্রী কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই স্বামীর সাথে থাকতে বা তার নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন, তবে স্বামী ভরণপোষণ বন্ধ করার অধিকার পান।

আপনার জন্য পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। আপনার ক্ষেত্রে কোনটি ‘যৌক্তিক কারণ’ হিসেবে গণ্য হবে, তা নির্ধারণ করতে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখবেন, সঠিক উপস্থাপনার অভাবে অনেক সময় সত্য ঘটনাও আদালতের কাছে গুরুত্ব হারায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top