পরকীয়া থেকে বাঁচতে দাম্পত্যে যা যা করা জরুরি। মনোবিজ্ঞান, আইন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ।
পরকীয়া কখনোই হঠাৎ জন্ম নেয় না, এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। একজন মানুষের মন, সম্পর্কের প্রতি তার উপলব্ধি, দাম্পত্যের পরিবেশ, ইত্যাদি মিলেই এটি তৈরি হয়। পরিবার ভাঙা রোধে কিছু বৈজ্ঞানিক, মানসিক, সামাজিক ও আইনি বিষয় জানা অত্যন্ত জরুরি। চলুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
শুরুতেই বলবো, ‘ইমোশনাল কানেকশন’ রক্ষা করুন। গবেষণা বলে, পরকীয়ার ৭০% শুরু হয় ইমোশনাল বা আবেগীয় দূরত্ব থেকে। কথা কমে যাওয়া, বিপরিতে অভিযোগ বেড়ে যাওয়া, একে অপরকে উপেক্ষা করা, শুনতে না চাওয়া, এগুলো সম্পর্ককে শুকিয়ে দেয়। প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিটের ‘অভিমানহীন কথা’, দাম্পত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষা হতে পারে। ভরসা রাখুন।
স্বচ্ছতা ও বিশ্বাস এই দুইয়ে মিলে নিরাপত্তার জন্ম দেয়। অতিরিক্ত সন্দেহ যেমন সম্পর্ককে মেরে ফেলে, তেমনি সীমাহীন গোপনীয়তা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। ফোন লুকানো, আচমকা নীরব আচরণ, সময়মতো না বাড়ি ফেরা, ইত্যাদি এগুলো দাম্পত্যে “অনিরাপত্তা” তৈরি করে, যা পরকীয়ার মাটি তৈরি করে বা ভিত্তি গড়ে দেয়। মানে রাখতে হবে, স্বচ্ছতা মানে নজরদারি নয়, বরং আস্থার পরিবেশ।
দাম্পত্যে সম্মান সবার আগে। মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, “যেখানে সম্মান থাকে না, সেখানে ভালোবাসা মরে যায়।“ গালাগালি, অবমূল্যায়ন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, অন্যের সামনে অপমান, এগুলো মানুষের মনকে অন্য জায়গায় আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য করে।
যৌনজীবন নিয়ে মুখ খোলা প্রয়োজন। অধিকাংশ দম্পতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়েই কথা বলেন না। দাম্পত্যে যৌনজীবন অসন্তুষ্ট হলে অনেকে বাইরে মানসিক সান্ত্বনা খোঁজেন। এটি বাস্তবতা। খোলামেলা আলোচনা, পরস্পরের প্রত্যাশা, চিকিৎসকের সাহায্য, শরীর-মন দুটোই সুস্থ রাখে।
আইন জানলে অপব্যবহার কমে। অনেকে পরকীয়াকে ‘খেলার মতো’ব্যাপার হিসেবে ধরে নেয় বা মনে করেন, এর কারণ হলো, পরকীয়ার পরিণতি না জানা। আইন বলছে, পরকীয়ার কারণে নিষ্ঠুরতা, অবহেলা, ভরণপোষণ, পৃথকবসবাস, ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার প্রতিকার আইনগতভাবে স্ত্রী অথবা স্বামী আদালতের মাধ্যমে চাইতে পারে।
গোপন বিয়ে, বিশেষ করে স্বামীর ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায়। এটি অপরাধমূলক প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে এবং পারিবারিক আদালত ও ফৌজদারি উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আইন জানলে পরিণতি বুঝে অনেকেই সম্পর্ক নিয়ে খেলাধুলা করতে সাহস পান না।
চলুন এবার সমাধানের বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক।
পারিবারিক দায়িত্ব ভাগাভাগি করুন। বাস্তবে অনেক সম্পর্ক ভাঙে, স্ত্রীর অতিরিক্ত চাপ বা স্বামীর একা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে। দায়িত্ব ভাগাভাগি, পরিবারের কিছু সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেওয়া, সন্তান লালনপালনে সহযোগিতা, মানসিক চাপ কমায় এবং সম্পর্কে নিরাপত্তা সৃষ্টি করে।
সময় দিন- এটাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার, সোশ্যাল মিডিয়া, সব মিলে আজ সবাই “হাফ অ্যাটেনশন” দেয়। দাম্পত্যে সময় না দিলে ভালোবাসা শুকিয়ে যায়, একা লাগা বাড়ে, তারপর সম্পর্কগুলো বাইরের পৃথিবীতে সান্ত্বনা খোঁজে!
যে কোনো তৃতীয় পক্ষকে কম জায়গা দিন। অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ সহকর্মী, মেসেঞ্জারে দীর্ঘ চ্যাট, ‘মানসিক সাপোর্ট’ নেয়া বা দেওয়ার নামে অন্য কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত কথা, এগুলো ধীরে ধীরে অনুভূতি সরিয়ে নেয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলে: “Emotional Transfer” যেখান থেকে পরকীয়ার সূচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কোন সমস্যা হলে লুকাবেন না, প্রথমেই সমাধান করে ফেলুন। ছোট সমস্যা লুকাতে লুকাতে বড় হয়ে যায়। অভিমান, আর্থিক টেনশন, কর্মক্ষেত্রের চাপ, পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে ভুল বোঝাবুঝি, এগুলো শেয়ার করলে সম্পর্ক আরও শক্ত হয়। তবে অভিযোগের সুরে আলোচনা নয়।
প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নিন, এটি লজ্জার কোনো বিষয় নয়। বিশ্বজুড়ে দাম্পত্য কাউন্সেলিং খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও এখন অনেক দম্পতি উন্নতি পাচ্ছেন। আপনার পাশে একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ থাকলে বিষয়গুলো আরও সহজ হয়।
সম্মতিতে তৈরি করা হালকা “বাউন্ডারি”, সঠিক শব্দে যেটাকে আমি বলি, ‘হেলদি বেরিয়ার’ বা ‘স্বাস্থকর বাধা’। যেমন, কারো সাথে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত চ্যাট নয়, কর্মস্থলের ভ্রমণের বিষয়ে আগে জানানো, রাতের পরে ফোনকল এড়িয়ে চলা, সোশ্যাল মিডিয়ার “সিক্রেট জোন” না রাখা, এগুলো সম্পর্ককে অধিক নিরাপদ করে।
ইসলামিক দৃষ্টিতে দাম্পত্যের পবিত্রতা রক্ষা করা। ইসলামে বিয়েকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বলা হয়েছে। যেখানে পরকীয়া শুধু পাপ নয়, পরিবার, সন্তান, সমাজের জন্য ক্ষতিগ্রস্তকারী কাজ হিসেবে চিহ্নিত। মনে রাখা জরুরি, ধর্মীয় মূল্যবোধ সিংহভাগে সময়ে পরকীয়াকে শুরুতেই থামিয়ে দেয়। পরকীয়া রোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র স্বামী স্ত্রী ‘দুইজনের সচেতনতা’। “বিশ্বাস” “সম্মান” “সময়” “স্বচ্ছতা” এবং “দায়িত্ব বণ্টন”, এই পাঁচটি মিললেই পরকীয়া প্রবেশের সুযোগ প্রায় থাকে না। আপনাদের দাম্পত্য রক্ষা করার দায়িত্ব দুজনেরই, কিন্তু জানার দায়িত্ব আপনার নিজের।