দ্বিতীয় বিয়ের আইনি বাস্তবতা? জেনে নিন দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার ও বড় ঝুঁকিগুলো-
বেশ কিছুদিন আগের একটা একটা ঘটনা বলছি আজ। ভদ্র মহিলা আমার চেম্বারে এসেছিলেন তার করুণ দশার কথা বলতে।
সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চলছিল। কিন্তু স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর জানতে পারলেন, তার বিয়ের কোনো সরকারি রেকর্ড বা রেজিস্ট্রি করা কাবিননামা নেই। আগের স্ত্রীর সন্তানরা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, আর আইনগত প্রমাণ না থাকায় তিনি স্বামীর সম্পত্তিতে নিজের অধিকারও দাবি করতে পারছেন না।” – আমাদের সমাজে এমন গল্প কাল্পনিক নয়, বরং তার মতো শত শত নারী প্রতিদিন এই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
আমাদের দেশে অনেক সময় বিভিন্ন সামাজিক বা পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে নারীরা দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, লোকলজ্জা বা গোপনীয়তা বজায় রাখার অজুহাতে স্বামীরা এই বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে চান না। কেবল মৌখিক কলেমা বা একটা সাদা কাগজে সই নিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়।
পরবর্তীতে যখন সম্পর্কের অবনতি ঘটে কিংবা স্বামী মারা যান, তখন এই নারীরা পড়েন চরম আইনি ও সামাজিক সংকটে। কাবিননামা না থাকায় তারা না পারেন দেনমোহর দাবি করতে, না পারেন স্ত্রীর সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্পত্তির অধিকার আদায় করতে।
বিস্তারিত আইনগত ব্যাখ্যা ও সচেতনতা:
১. কাবিননামা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক: ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিটি মুসলিম বিয়ে সরকারিভাবে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। বিয়ে প্রথম হোক বা দ্বিতীয়, আইনের চোখে কোনো পার্থক্য নেই। কাবিননামা (নিকাহনামা) ছাড়া আইনের আদালতে বিয়ের কোনো শক্তিশালী লিখিত প্রমাণ থাকে না। তাই বিয়ের সময়ই কাজি ডেকে তা সরকারি খাতায় লিপিবদ্ধ করা আবশ্যক।
২. পূর্বের বিয়ের অনুমতিপত্র যাচাই: ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে স্থানীয় সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। একজন সচেতন নারী হিসেবে দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বরের কাছে এই অনুমতিপত্র দেখতে চাওয়া আপনার প্রধান দায়িত্ব।
যদি স্বামী এই অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেন, তবে সেই বিয়েটি ধর্মীয়ভাবে বাতিল না হলেও আইনিভাবে অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে এবং প্রথম পক্ষ যেকোনো সময় মামলা করতে পারে, যা দ্বিতীয় স্ত্রীর জীবনেও অশান্তি ডেকে আনে।
৩. আইনি সুরক্ষা ও অধিকার: যদি দ্বিতীয় বিয়েটি আইনসম্মতভাবে রেজিস্ট্রি করা হয়, তবে প্রথম স্ত্রীর মতোই দ্বিতীয় স্ত্রীও সমান আইনি অধিকার পান। তিনি স্বামীর কাছ থেকে নিয়মিত খোরপোশ (ভরণপোষণ) ও দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী হন এবং স্বামীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে আইনগত অংশীদার বা উত্তরাধিকারী হন। কিন্তু কাবিননামা না থাকলে এই সবকটি অধিকারই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
আইনজীবীর পরামর্শ:
আবেগ বা অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না। বিয়ে গোপন রাখার অজুহাতে কোনো পুরুষ যদি কাবিননামা রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকৃতি জানান, তবে শুরুতেই সতর্ক হোন। আইনি দলিলই একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। যেকোনো আইনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে বা বিয়ের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।