কাবিননামায় অতিরিক্ত দেনমোহর ধার্য করার সামাজিক ও আইনি বিপদ

আইন সহায়িকা ব্যানার। “কাবিননামায় অতিরিক্ত দেনমোহর ধার্য করার সামাজিক ও আইনি বিপদ” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

“কাবিনে ৫০ লাখ টাকা লিখে ছেলেকে বেঁধে রাখা যাবে”- এমনটাই ভেবেছিল মেয়ের পরিবার।

বিয়ের সময় সবাই খুশি। আত্মীয়-স্বজনের সামনে সম্মান, সামাজিক মর্যাদা আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবে কাবিননামায় লেখা হলো ৫০ লাখ টাকা দেনমোহর। ছেলেটির সেই অর্থ পরিশোধ করার বাস্তব সামর্থ্য ছিল না, কিন্তু তখন কেউ তা নিয়ে ভাবেনি।

কয়েক বছর পর দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হলো। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। তখনই সামনে এলো সেই কাবিননামা। যে অঙ্কটি একসময় ছিল সামাজিক গর্বের বিষয়, সেটিই হয়ে দাঁড়াল দীর্ঘ আইনি বিরোধ, মানসিক চাপ এবং দুই পরিবারের তিক্ততার অন্যতম কারণ।

এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিরল নয়।

বর্তমানে আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই সামর্থ্যের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রেখে অত্যন্ত উচ্চ অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করা হচ্ছে। কেউ সামাজিক মর্যাদা দেখাতে চান, কেউ মনে করেন বেশি দেনমোহর লিখলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে, আবার কেউ বিশ্বাস করেন এতে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে বা তালাক দেওয়ার সাহস পাবে না।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন।

দেনমোহর ইসলামে স্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অধিকার। এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, আবার ভয় দেখানোর অস্ত্রও নয়। কাবিননামায় যে পরিমাণ দেনমোহর লেখা হয়, সেটি স্বামীর ওপর আইনগত দায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে অবাস্তব বা সামর্থ্যের বাইরে অঙ্ক নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতে তা নিয়ে বিরোধ, মামলা এবং জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অন্যদিকে, খুব কম দেনমোহর নির্ধারণ করাও অনেক সময় স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারে না। তাই একদিকে অবাস্তব উচ্চ অঙ্ক, অন্যদিকে অযৌক্তিকভাবে কম অঙ্ক, দুইটিই সমস্যার কারণ হতে পারে।

দেনমোহর নির্ধারণের সময় কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত –

স্বামীর বাস্তব আর্থিক সক্ষমতা।
উভয় পরিবারের পারস্পরিক সমঝোতা।
ভবিষ্যতে বাস্তবে পরিশোধ করা সম্ভব কি না।
কেবল সামাজিক প্রতিযোগিতা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে অঙ্ক নির্ধারণ না করা।

মনে রাখবেন, কাবিননামা শুধু একটি কাগজ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দলিল। এখানে লেখা প্রতিটি তথ্য ভবিষ্যতে আদালতে গুরুত্ব পেতে পারে। তাই কাবিননামা পূরণের সময় আবেগ নয়, সচেতনতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সচেতন সিদ্ধান্তই একটি সুন্দর দাম্পত্যের ভিত্তি। আর অবাস্তব প্রতিশ্রুতি নয়, পারস্পরিক বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধই একটি সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে।

Share the Post:
Scroll to Top