“আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন রেহানা বেগম। সাত বছরের সংসার ভেঙে যাওয়ার পর তার প্রাক্তন স্বামী দাবি করেছেন, বিয়ের সময় তাদের পরিবার থেকে দেওয়া ১০ ভরি গহনা ফেরত না দিলে তিনি দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করবেন না। রেহানার নিজের বাবার বাড়ির দেওয়া গহনাগুলোও এখন শ্বশুরবাড়ির আলমারিতে বন্দি।”
একজন আইনজীবী হিসেবে রেহানার মতো শত শত নারীর এই অসহায়ত্ব আমি প্রতিনিয়ত দেখি। বিবাহ বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের পর কনের গহনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যে টানাপোড়েন শুরু হয়, তা অনেক সময় দেনমোহরের চেয়েও জটিল রূপ নেয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন, বিচ্ছেদের পর শ্বশুরবাড়ির দেওয়া গহনা কি আসলেই ফেরত দিতে হয়?
আজ এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে আইন এবং আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত কী বলে, তা পরিষ্কার করব।
গহনাকে জিম্মি করে দেনমোহর আটকানো:
আমাদের সমাজে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা দেখা যায়, বিচ্ছেদ হলেই বরপক্ষ কনের সব গহনা আটকে রাখতে চায় অথবা কনেপক্ষকে গহনা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। অনেক সময় কনেকে তার বাবার বাড়ির দেওয়া গহনাটুকুও নিতে দেওয়া হয় না। সাধারণ মানুষের ধারণা, সম্পর্ক যখন নেই, তখন গহনাও ফেরত দিতে হবে। এই ভুল ধারণার কারণে নারীরা তাদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং চরম মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
বিস্তারিত আইনগত ব্যাখ্যা ও উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গহনার মালিকানার বিষয়টি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নারীবান্ধব:
১. স্ত্রীধন (Stridhan) ও একক মালিকানা: মুসলিম এবং হিন্দু পারিবারিক আইন অনুযায়ী, বিয়ের সময় কনেকে দেওয়া সমস্ত অলঙ্কার (তা কনের নিজের পরিবারের হোক কিংবা বরের পরিবারের হোক) কনের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যাকে আইনি ভাষায় ‘স্ত্রীধন’ বলা হয়।
২. বরপক্ষের দেওয়া গহনা কেন ফেরতযোগ্য নয়? বরের পরিবার যখন বিয়ের আসরে বা বিয়ের পর কনেকে গহনা উপহার দেয়, তখন আইনত সেটি ‘পূর্ণাঙ্গ দান’ বা ‘হেবা’ (Gift) হিসেবে গণ্য হয়। চুক্তি আইন এবং মুসলিম আইনের নীতি অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দান সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর দাতা তা আর কোনোভাবেই প্রত্যাহার বা ফেরত চাইতে পারেন না। সুতরাং, বিচ্ছেদ হলেও বরের দেওয়া গহনা বরের পরিবার ফেরত পাওয়ার কোনো আইনি অধিকার রাখে না।
৩. উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত: আমাদের দেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন মামলায় স্পষ্ট রায় দিয়েছেন যে, “বিয়ের সময় কনেকে উপহার হিসেবে দেওয়া গহনা অলঙ্কার কনের নিজস্ব সম্পত্তি। বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও স্বামী বা তার পরিবার এই গহনা জোরপূর্বক নিজের হেফাজতে রাখতে পারবে না। যদি রাখা হয়, তবে তা আইনত অপরাধ।” আদালত আরও স্পষ্ট করেছেন যে, গহনা ফেরত না দেওয়ার অজুহাতে স্বামী তার স্ত্রীর দেনমোহর বা ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ বকেয়া রাখতে পারবেন না।
সাধারণ প্রতিকার ও করণীয়
যদি বিবাহ বিচ্ছেদের পর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন কনের গহনা ফেরত দিতে অস্বীকার করে বা আটকে রাখে, তবে কনে নিম্নোক্ত আইনি প্রতিকার পেতে পারেন:
১. পারিবারিক আদালতে মামলা: পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ অনুযায়ী কনে তার গহনা অথবা সেই গহনার বর্তমান বাজারমূল্য আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারেন।
২. ফৌজদারি আইনের আশ্রয়: স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তার গহনা আত্মসাৎ করা বা বিক্রি করে দেওয়া দণ্ডবিধির ৪০৬ ও অন্যান্য ধারা অনুযায়ী ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ (Criminal Breach of Trust)। এর জন্য থানায় বা আদালতে মামলা করা যায়।
৩. প্রমাণ সংরক্ষণ: আইনি লড়াইয়ে জেতার জন্য বিয়ের সময় গহনা আদান-প্রদানের ছবি, ভিডিও এবং সম্ভব হলে স্বর্ণের মেমো বা রসিদ নিজের হেফাজতে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ পরামর্শ: আইন সবার জন্য সমান হলেও, প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ঘটনার বিবরণ সাধারণত ভিন্ন হয়। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া বা চুক্তি করার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করা সবসময় শ্রেয়। উপরোক্ত আলোচনায়, সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হল।