তালাক পরবর্তী বিবাহের নিয়মকানুনগুলো ভিন্ন হয় কেন?

যেহেতু তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে দিয়েছেন, সেহেতু তা কার্যকর হয়ে গেছে! তাই তার আর কোনো বাঁধা নেই নতুন করে বিয়ে করতে! আমার কাছে প্রায়ই এমন কিছু প্রসঙ্গ আসে, যেখানে আবেগ এবং আইনি বাধ্যবাধকতা যেন মুখোমুখি জড়িয়ে যায় যুদ্ধে।

যেমন, স্বামী বেচারা হয়তো তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে দেয়ার পরদিনই বিয়ে করতে চাইলেন। তিনি ধরে নিয়েছেন, যেহেতু নোটিশ পাঠানো হয়েছে, সেহেতু তার অন্য জায়গায় বিয়ে করতে আর কোন আইনি বাঁধা নেই।

অন্যদিকে, তার প্রাক্তন স্ত্রী, সেও হয়তো চাইছেন নতুন জীবন শুরু করতে। কখনও কখনও নারীদের কাছ থেকেও এমন প্রশ্ন পেয়েও থাকি। স্বামীকে নোটিশ পাঠিয়েই তিনি বিয়ে করতে চাইছেন! কিন্তু যখনই বলা হলো, তাকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, তখনই যেন তার ঘোর ভেঙ্গে যায়।

আমাদের দেশের পারিবারিক আইন এই ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, যা না মানলে সেই নতুন বিবাহ আইনত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা না জানার কারণে অনেক দম্পতিই আইনি বিপদে পড়েন। চলুন, তালাকের পর নারী ও পুরুষের জন্য নতুন বিয়ের আইনগত সময়সীমা কত, অন্যান্য বিধি-বিধান কী, তা স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা:
তালাকের পর বিবাহ করার সময়সীমা-

তালাকের পর নতুন বিবাহ করার সময়সীমা মূলত নির্ভর করে তালাক প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়া এবং নারীর ক্ষেত্রে ‘ইদ্দতকাল’ সম্পন্ন হওয়ার ওপর।

তালাক কার্যকর হওয়ার সময়সীমা (নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে):

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, তালাকের নোটিশ জারি হওয়ার পর এবং সালিসি পরিষদ কর্তৃক নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন অতিবাহিত না হলে তালাক কার্যকর হয় না। নারী ও পুরুষ উভয়েই এই ৯০ দিন পার হওয়ার পরই কেবল নতুন বিয়ে করতে পারেন।

যদিও এখানে দু’একটি ব্যতিক্রম আছে। যেমন, খুলা তালাক হলে স্বামী তালাক সম্পন্ন হবার সাথে সাথেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। সেটা নিয়ে সামনে কোন এক সময় আলোচনা করা হবে।

নারীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা (ইদ্দতকাল)-

ইদ্দতকাল: ৯০ দিনের মধ্যে তালাক কার্যকর হলেও, নারীকে এই ৯০ দিনের বাইরেও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যাকে ‘ইদ্দতকাল’ বলা হয়।

ইসলামি আইন অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার পর নারীকে তিন মাসিক ঋতুস্রাব (Three menstrual cycles) সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এর উদ্দেশ্য হলো- যদি নারী অন্তঃসত্ত্বা হন, তবে সন্তানের পিতৃত্ব নিশ্চিত করা। গর্ভধারণ করলে, সন্তান জন্মের পর তালাক কার্যকর হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: কোনো নারী ইদ্দতকাল শেষ না করে নতুন বিয়ে করলে, সেই বিয়েটি আইনত বাতিল বা পুরোপুরি অবৈধ (Null and Void) বলে গণ্য হবে। আর ধর্মীয় বিধান হচ্ছে, তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত পালন ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা হারাম এবং এটি গর্ভে পূর্ব স্বামীর সন্তান আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য

পুরুষের ক্ষেত্রে সময়সীমা: তালাকের নোটিশের ৯০ দিন সময়সীমা পার হওয়ার পরই পুরুষও নতুন বিবাহ করতে পারেন। তবে পুরুষ যদি ৯০ দিন পার হবার আগে বিয়ে করে ফেলেন, সেটা বেআইনি হলেও বিয়ে অবৈধ হবে না। যদিও স্ত্রীকে দেনমোহরসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়।

আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। ইদ্দতকাল ও তালাক কার্যকরের প্রক্রিয়া সঠিকভাবে না মানলে নতুন বিবাহ আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top