সন্তান মায়ের কাছে থাকলে, কীভাবে ভরণপোষণ পাবে? নিয়মকানুনগুলো কী?

“বাচ্চা তো আর আমার কাছে থাকে না, আমি তার জন্য টাকা দিতে পারবো না। যদি বাচ্চার জন্য খরচ পেতে চাও, তবে আমার বাসায় দিয়ে যাও।”- কথাগুলো ছায়া বেগমকে বলছিলেন তার প্রাক্তন স্বামী। যদিও ইতিমধ্যে তার স্বামী নতুন করে বিয়েশাদি করে সংসার পেতে ভালোই আছেন! তিনি জানেন, তাদের আর তার বাড়িতে যাবার কোন পথই খোলা নেই।

বিচ্ছেদের পর তিন বছরের ছোট্ট শিশুটি মায়ের কাছেই বড় হচ্ছে। পিতা-মাতাহীন ছায়া বেগম টিউশনি আর কাছের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ধারকর্জ করে বাচ্চার খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু হিমশিম খাচ্ছেন।

অন্যদিকে তার প্রাক্তন স্বামী আর্থিকভাবে যথেষ্ট সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও এই অজুহাতে এক টাকাও দিচ্ছেন না যে, সন্তান তো তার কাছে নেই। ছায়া বেগমও দ্বিধায় পড়ে গেছেন, আইন কি আসলেই বাবার এই একতরফা শর্তকে সমর্থন করে?

আইন কী বলে?

একজন আইনজীবী হিসেবে বহুবার আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, সন্তান মায়ের কাছে থাকা মানেই বাবার আর্থিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং আইন এখানে অত্যন্ত কঠোর:

১. জিম্মাদারি বনাম ভরণপোষণ: সন্তান কার কাছে থাকবে (Custody) এবং সন্তানের খরচ কে দেবে (Maintenance) -এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সন্তান মায়ের কাছে থাকাটা মায়ের অধিকার (জিম্মাদারি), কিন্তু সন্তানের খরচ বহন করা বাবার একক এবং বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। সন্তান বাবার কাছে নেই, এই অজুহাতে ভরণপোষণ বন্ধ করার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

২. মায়ের সামর্থ্য কি ধর্তব্য? অনেক সময় বাবা দাবি করেন যে, মা তো চাকরি করেন বা বড়লোক, তাই তার টাকা দেওয়া লাগবে না। এটি ভুল ধারণা। মুসলিম আইন অনুযায়ী, মা যদি কোটিপতিও হন, তবুও সন্তানের ভরণপোষণের প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব বাবারই।

৩. কতটা খরচ দিতে হবে? খরচ কেবল ‘ডাল-ভাতের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাবার আর্থিক সামর্থ্য এবং সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী সন্তানের খাবার, পোশাক, শিক্ষা এবং চিকিৎসার সুব্যবস্থা বাবাকেই করতে হবে। এমনকি বাচ্চা যদি প্রতিবন্ধি হয় তবে তার জীবদ্দশায় অথবা মেয়ে সন্তান যদি বিবাহের পর তালাকও হয়ে ফিরে আসে, তবে তখনও বাবাকেই তার ভরণপোষণ বহন করতে হবে।

৪. বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক ও মুসলিম আইন অনুযায়ী সন্তানের জিম্মাদার এবং অভিভাবকত্ব-এর মধ্যে মৌলিক ও আইনগত পার্থক্য রয়েছে।

জিম্মাদার: এটি মূলত সন্তানের দৈনন্দিন দেখাশোনা, লালন-পালন এবং শারীরিক রক্ষণাবেক্ষণের অধিকারকে বোঝায়। মুসলিম আইন অনুযায়ী, মা সন্তানের জিম্মাদার বা রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে স্বীকৃত। ছেলে সন্তান ৭ বছর এবং মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকতে পারে।

অভিভাবক: এটি সন্তানের শরীর ও সম্পত্তির ওপর পূর্ণ আইনগত কর্তৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে বোঝায়। মুসলিম আইন এবং ১৮৯০ সালের ‘অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন’ অনুযায়ী, পিতাই সন্তানের স্বাভাবিক এবং আইনগত অভিভাবক। মায়ের জিম্মাদারির সময়কালেও পিতা সন্তানের অভিভাবক হিসেবে বহাল থাকেন।

সুতরাং

  • সন্তান যেখানেই থাকুক, খরচ দেওয়া বাবার আইনগত বাধ্যবাধকতা।
  • বাবার সান্নিধ্য পাওয়া আর ভরণপোষণ পাওয়া- দুটি ভিন্ন বিষয়।
  • মায়ের আয় থাকলেও সন্তানের খরচ দেওয়ার মূল দায়িত্ব বাবার।
  • অনাদায়ে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে বকেয়াসহ টাকা আদায়ের সুযোগ আছে।

প্রতিকার কী?

যদি কোনো বাবা তার সন্তানের খরচ দিতে গড়িমসি করেন, তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি আপনার নিকটস্থ পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণের মামলা করতে পারেন। আদালত বাবার আয় ও সামর্থ্য বিচার করে একটি মাসিক খরচের অংক নির্ধারণ করে দেবেন। এই আদেশ অমান্য করলে আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এমনকি কারাদণ্ডেরও বিধান রয়েছে।

তবে, সর্বপ্রথমে যেতে হবে, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে। পারিবারিক আইনগুলো সংক্রান্ত সমস্যার প্রথম ধাপ হলো, জেলা লিগ্যাল এইড।

আপনার জন্য পরামর্শ: প্রতিটি মামলার প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। আইনকানুনগুলো একই হলেও উপস্থাপনের ধরনে ফলের ভিন্নতা আসে। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। উপরোক্ত আলোচনায় কেবল সাধারণ প্রতিকারগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top