একটা সাংঘাতিক সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হয়েছে দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা নিয়ে! ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নারীকে পুরুষের ‘সম্পত্তি’ হিসেবে গণ্য করা, মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদির দোহাই দিয়ে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এই দেড় শত বছরের পুরনো আইনটি বাতিল করে। এই রায়ের পর ভারতে পরকীয়া (Adultery) আর ফৌজদারি অপরাধ নয়।
আবারও বলছি, এটা কিন্তু ভারতের ঘটনা। অনেকেই এই ব্যাখ্যা ও পরিবর্তনকে বাংলাদেশের আইনে প্রয়োগ করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে এমনটি চোখে পড়ে। যদিও এ ধরণের প্রয়াস চালানো কঠিন কিছু নয়। বৃটিশ শাসনের সময় তৈরিকৃত আইনগুলো এখন চালু রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন দেশে; বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্থানসহ অন্যান্য দেশে।
তাহলে দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থা কী?
এক কথায় বাংলাদেশে এই আইন নিয়ে আলোচনা সমালোচনা থাকলেও দণ্ডবিধি ৪৯৭ আগের মতোই পুরোদমেই বলবৎ রয়েছে। অর্থাৎ এদেশের প্রেক্ষাপটে পরকীয়া বা ব্যভিচার সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যেখানে পুরুষের ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও এই আইনে নারীর শাস্তির কোন বিধান নেই।
যদিও এদেশে আজকাল তথাকথিত আধুনিকতার দোহাই দিয়ে পরকীয়াকে ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বা ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। একজন আইনজীবী হিসেবে প্রতিদিন আমি যা দেখি, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।
আজ যা একটি গোপন মেসেজ বা নিছক হাসি-ঠাট্টা, কাল সেটাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে খুনের মামলা, ভাঙা ঘর আর একরাশ মানসিক বিপর্যয়ের মূল কারণ। পরকীয়া আসলে কোনো প্রেম নয়, এটি চরিত্রের একটি বড় দুর্বলতা। পরকীয়ার পুরো আইনটাই বাতিল করা দরকার নাকি সংশোধন করা দরকার, সেই আলোচনা অন্য কোন দিন করা যাবে।
কদিনে আগে আমার কাছে আসা একটি ঘটনা অতি সংক্ষেপে বলি। স্বামীটির একটি পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। স্ত্রী সেটি সহ্য করতে না পেরে যখন প্রতিবাদ করলেন, কিছুদিনের মধ্যে ঘরের অশান্তি চরমে পৌঁছাল। এক রাতে সেই পরকীয়ার জের ধরে স্বামী ও তার প্রেমিকা মিলে স্ত্রীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে এবং সেই রাতেই তারা অঘটনটি ঘটিয়ে ফেলেন!
শুধুমাত্র পরকীয়ার জের ধরে ঘটা খুনের মামলায় সেই স্বামীটি এখন কারাগারে, আর তাদের সাত বছরের একমাত্র সন্তানটি এতিমের মতো আত্মীয়দের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।
আইনগত ব্যাখ্যা: দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা ও আপনার অধিকার
অনেকেই মনে করেন পরকীয়া করলে আইনের কিছু করার নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা বহাল আছে। এই আইনের খুঁটিনাটিগুলো আপনার জানা জরুরি। বলছি বিস্তারিত:
১. ব্যভিচারের শাস্তি: দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে তার স্বামীর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তা ‘ব্যভিচার’ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য দোষী ব্যক্তির ৫ বছর পর্যন্ত জেল, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
২. খুন ও মামলার ঝুঁকি: পরকীয়ার জেরে ঘটা অপরাধগুলো (যেমন: আত্মহত্যার প্ররোচনা, মারধর বা হত্যা) দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারায় আরও কঠোর শাস্তির মুখে ফেলে দেয়।
৩. ভরণপোষণ ও দেনমোহর: স্বামী পরকীয়ায় লিপ্ত হলে স্ত্রী বিচ্ছেদ না করেও তার পূর্ণ দেনমোহর এবং মাসিক খোরপোষ দাবি করে মামলা করতে পারেন।
৪. সন্তানের হেফাজত: পরকীয়া বা চারিত্রিক স্খলন প্রমাণিত হলে আদালতের মাধ্যমে সন্তানের হেফাজত (Custody) পাওয়ার ক্ষেত্রে দোষী পক্ষ আইনিভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
সুতরাং, পরকীয়া বা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক অথবা অনৈতিক যোগাযোগ কোনক্রমেই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা অধিকার হতে পারে না। যে যোগযোগের পরিণতি পুরো পরিবারকে ধ্বংশ করে দেয়, মানুষকে গুম-খুনের দিকে নিয়ে যায়, তা যে কোন দেশেই যে কোন ব্যাখ্যাতেই অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে বাধ্য।
আইনজীবীর বিশেষ পরামর্শ: যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে, তখন ঘরের মানুষগুলোকেই সচেতন হতে হবে। পরকীয়া কোনো সমাধান নয়, বরং শত সহস্র সমস্যার জন্মদাতা। এর প্রভাবে সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় নিষ্পাপ সন্তানরা। তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে নিজের সাজানো সংসারকে ধ্বংস করবেন না। যে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। সঠিক আইনি পথই আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে সুরক্ষা দিতে পারে।