একটি সুন্দর সাজানো সংসার ধ্বংস করার জন্য একটি ‘ভুল সন্দেহ’ই যথেষ্ট! আমাদের সমাজে বর্তমান সময়ে পরকীয়া যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অতি-সন্দেহ প্রবণতা। অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী বা স্ত্রীর কোনো বন্ধু, আত্মীয় বা প্রতিবেশীর সাথে অতি সাধারণ মেলামেশা বা কথাবার্তাকে অন্য পক্ষ সরাসরি পরকীয়া বা ‘বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক’ হিসেবে ধরে নেন। এই ভিত্তিহীন সন্দেহ থেকে শুরু হয় অশান্তি, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গিয়ে ঠেকে যায়। যেতে পারে আদালত অবধি!
দিন কয়েক আগের একটি ঘটনা শুনুন। চেম্বারে আসা এক দম্পতির কথা বলি। স্বামী বিদেশে থাকতেন। দেশে থাকা স্ত্রী তার এক দূর সম্পর্কের কাজিন বা ভাইয়ের সাথে পারিবারিক কিছু প্রয়োজনে প্রায়ই ফোনে কথা বলতেন। প্রতিবেশীদের কানাঘুষায় স্বামী দেশে ফিরেই কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে মারধর করেন এবং তালাকের নোটিশ পাঠান।
পরবর্তীতে তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা গেল, বিষয়টি ছিল নিতান্তই পারিবারিক যোগাযোগ। কিন্তু ততক্ষণে সন্দেহ আর অপবাদে একটি সাজানো সংসার পুরোপুরি তছনছ হয়ে গেছে। শুধু যে প্রবাসী ব্যক্তিটির সংসার ভেঙেছে তাই-ই নয়, যে মানুষটি বিনা স্বার্থে সেই প্রবাসীর সহায়-সম্পত্তির বিষয়ে উপকার করতে এসেছিলেন, ভেঙেছে তারও পরিবার। সেখানে এই ‘সন্দেহ’ নামক বিষের ভার বহন করছে নিতান্ত নিরাপরাধ অসহায় দুটি শিশুও!
তাহলে আসল পার্থক্য কোথায়?
মনে রাখা জরুরি, স্বাভাবিক সম্পর্ক সর্বদা খোলামেলা ও স্বচ্ছ, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, লুকানোর প্রবণতা থাকে না এবং সীমার মধ্যে দৃশ্যমান থাকে। অন্যদিকে, সন্দেহজনক বা অনৈতিক সম্পর্ক গোপনীয়তা ও লুকোচুরি করে, অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা বেড়ে ওঠে, পরিবারের প্রতি অবহেলা সৃষ্টি হয় এবং আবেগগত বা শারীরিক বিচ্যুতি ঘটে, ইত্যাদি। সুতরাং সন্দেহ করার আগে এই পরিস্থিতিগুলো যাচাই-বাছাই করা দরকার।
আইনগত ব্যাখ্যা ও সতর্কতা:
আইনের চোখে পরকীয়া বা ব্যভিচার একটি গুরুতর বিষয়। তবে মনে রাখা জরুরি:
১. প্রমাণের দায়ভার: আপনি যদি কারো বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ আনেন, তবে তা আদালতে প্রমাণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ আপনার। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ (যেমন: অকাট্য ভিডিও, অডিও বা শারীরিক সম্পর্কের প্রমাণ) ছাড়া কেবল কারো সাথে কথা বলা বা হাসাহাসি করাকে পরকীয়া বলা যায় না।
২. মানহানির মামলা: যদি আপনি কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা পরকীয়ার অপবাদ দেন এবং তা সমাজে বা আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রচার করেন, তবে ওই ব্যক্তি আপনার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মানহানির মামলা করতে পারেন। এতে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
৩. পারিবারিক নির্যাতন: ভিত্তিহীন সন্দেহ থেকে স্বামী বা স্ত্রী যদি অন্য পক্ষের ওপর মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন করেন, তবে সেটি পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা: কারো ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা বন্ধুত্বের বিষয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দেওয়া বা ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ করা সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু সন্দেহ বা ধারণার ভিত্তিতে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আদালত দেখে বাস্তব প্রমাণ, আচরণের ধারাবাহিকতা এবং মানসিক বা সামাজিক ক্ষতির প্রভাব। তাই সন্দেহ হলে, আগে কথা বলুন, পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করুন। অযথা বা ভুল সন্দেহ মিথ্যে হলেও অনেক সময়ই সত্যিকারের সম্পর্ককে ভেঙে দেয়।
আইনজীবীর পরামর্শ: অন্ধ সন্দেহ করার আগে বাস্তবতাকে বুঝুন। পরকীয়া যেমন অপরাধ, তেমনি একজন নির্দোষ ব্যক্তির ওপর পরকীয়ার তকমা দেওয়াও আইনত ও নৈতিকভাবে দণ্ডনীয়। আপনার সম্পর্কের টানাপোড়েন যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে আপনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন, তবে আবেগের বশে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। আইন ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আপনার করণীয় নির্ধারণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।