পরকীয়ার কারণে একটি সংসার ভেঙে যায়। তারপর, হাজারটা অনিবার্য অঘটনের মধ্যে একটা প্রশ্ন বড় করে দেয়া দেয়-
- ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে?
- পিতা বা মাতা কি শুধু “ভালো মা বা ভালো বাবা” হলেই অভিভাবকত্ব পাবে?
- নাকি পরকীয়াকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্তানের অভিভাবকত্ব হারাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আবেগে নয়, আইনের নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়। চলুন জেনে নেয়া যাক।
বাংলাদেশে অভিভাবকত্ব নির্ধারণের মূল নীতিগুলো-
সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণে আদালত সর্বপ্রথম যেটিকে গুরুত্ব দেয়, তা হলো “সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ” (Child Welfare) (Best Interest of the Child)। মনে রাখবেন, শুধু পরকীয়ার ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত নয়, সকল ক্ষেত্রেই সকল আইনের ক্ষেত্রেই এই নীতি প্রযোজ্য।
এখানে, মা বা বাবার ‘অপরাধ’ বা ‘কে অপরাধী” সেটা মোটেও বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো সন্তানের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা এবং সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা।
পরকীয়া কি অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলে?
উত্তর হলো- না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে নয়। পরকীয়া নিজে থেকেই কাউকে অভিভাবকত্ব থেকে বঞ্চিত করে না।
তবে যদি প্রমাণ হয় যে, পরকীয়ার কারণে সন্তানের অবহেলা হয়েছে, শিশুর মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে,
অনৈতিক পরিবেশে সন্তান বড় হচ্ছে, তখন আদালত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
আর সাধারণভাবে কারা সন্তানের হেফাজত (কাস্টডি) পান?
অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান (বিশেষ করে ছোট বয়সে) সাধারণত মায়ের হেফাজতে দেওয়া হয়। তবে শর্ত হলো, মা সন্তানের যত্ন নিতে সক্ষম, স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিকর।
অন্যদিকে পিতা পান, আইনগত অভিভাবকত্ব (Guardianship), ভরণপোষণের দায়িত্ব, সাক্ষাৎ (Visitation) অধিকার, ইত্যাদি।
কিন্তু এটি কোনো কঠোর নিয়ম বা একমাত্র নিয়ম নয়, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আদালত আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
আদালত যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি দেখে: আদালত সাধারণত বিবেচনা করেন-
- সন্তানের বয়স ও মানসিক অবস্থা
- কে নিয়মিত যত্ন নিচ্ছে
- আর্থিক ও আবাসিক নিরাপত্তা
- শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ
- নৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ
- বাবা-মায়ের আচরণ সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলছে কি না
- সন্তানের মতামত (যদি বয়স উপযুক্ত হয়), ইত্যাদি। যার লক্ষ্য একটাই, সন্তান যেন সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ পায়।
পরকীয়ার কারণে ডিভোর্স হলেও কী সম্ভব?
- কাস্টডি এক জনের
- অন্য জনের সাক্ষাৎ অধিকার
- শর্তসাপেক্ষ কাস্টডি
- প্রয়োজনে ভবিষ্যতে কাস্টডি পরিবর্তন, ইত্যাদি।
আদালতের আদেশ চূড়ান্ত নয়, পরিস্থিতি বদলালে পুনর্বিবেচনা সম্ভব।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, ডিভোর্স স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়, সন্তানের সঙ্গে নয়। তাই আদালত, প্রতিশোধ নয়,
সন্তানের জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা দরকার। যা সাধারণ মানুষ প্রায়শই ভুল করেন। তারা সন্তানের হেফাজত ও ভরণপোষণ এবং অভিভাকত্ব গুলিয়ে ফেলেন। সেই সাথে এগুলোর বয়সও সাধারণভাবে নির্ধারণে গোলমাল করেন। পরবর্তীতে কোন একদিন এ সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
আপনার করণীয়-
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও আইনি পদক্ষেপও ভিন্ন হবে। ‘যুক্তিযুক্ত কারণ’ আদালতে প্রমাণের ওপর নির্ভর করে। আপনার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার সঠিক আইনি সমাধান পেতে, কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।