প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে; অতঃপর

প্রসঙ্গটা আচমকাই আমাকে থমকে দিয়েছেল। “আমার স্বামী তো বলছে, শুধু দ্বিতীয় কেন, আরও তিনটে বিয়ে করার অধিকার তার আছে। সেই দাবি নিয়ে সে ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিয়ে করেও ফেলেছেন।”

কয়েকদিন আগের কথা। এক ভদ্রমহিলা এলেন দেখা করতে। তার চোখে ছিল রাজ্যের হতাশা। তিনি বললেন, “গত ছয় মাস ধরে আমার স্বামীর আচরণ সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল। পরে জানতে পারলাম, তিনি গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন, শুধু দ্বিতীয় বিয়ে কেন, তৃতীয় বিয়ে এবং চতুর্থ বিয়ে করার অধিকারও তার আছে।

এভাবে অনেকেই মনে করেন, যেহেতু ইসলামে পুরুষের একাধিক বিয়ের অনুমতি আছে, তাই এর জন্য স্ত্রীর অনুমতির কোনো দরকার নেই। এমনকি পুরো ব্যাপারটা পুরুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার!

কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন মুসলিম পুরুষ চাইলেই তার ইচ্ছামতো দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না। বাংলাদেশের আইন এই বিষয়ে খুব স্পষ্ট। এই অজ্ঞতার কারণে অনেক পুরুষই বেআইনিভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করে পারিবারিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আর অনেক নারী তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে অসংখ্য পরিবারে অশান্তি নেমে আসে।

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে:

আইন কী বলে? মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, কোনো মুসলিম পুরুষ প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে তাকে অবশ্যই নিম্নলিখিত দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে:

১. সালিসি পরিষদের অনুমতি: স্বামীকে সংশ্লিষ্ট এলাকার চেয়ারম্যান, মেয়রের (সালিসি পরিষদের, Arbitration Council) কাছে প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য লিখিত আবেদন করতে হবে।

২. প্রথম স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি: সালিসি পরিষদ প্রথম স্ত্রী বা স্ত্রীদের মতামত যাচাই করবে। তাদের অনুমতি ছাড়া  সাধারণত দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয় না (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি ছাড়াও সালিসি পরিষদ স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিতে পারে যদি তারা মনে করে যে, এই বিবাহ প্রয়োজনীয় ও ন্যায্য। সাধারণত স্ত্রীর শারীরিক, মানসিক অসুস্থতা, সন্তান না হওয়া, বা স্বামী আর্থিকভাবে সক্ষম কি না, এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে পরিষদ এই সিদ্ধান্ত নেয়।

সালিসি পরিষদ যেসব বিশেষ ক্ষেত্র বিবেচনা করতে পারেন-

–             প্রথম স্ত্রী সন্তান জন্মদানে অক্ষম হলে হলে।

–             প্রথম স্ত্রী গুরুতর বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে এবং এর ফলে সংসার করা বা দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

–             স্ত্রী মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা অন্য কোনো কারণে দাম্পত্য জীবন ও দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে।

–             স্ত্রীর অনিচ্ছাকৃত বা দীর্ঘমেয়াদী নিখোঁজ থাকলে, অথবা দীর্ঘ দিনের জেল হয়ে থাকলে এছাড়াও

–             সালিসি পরিষদ যদি মনে করে যে দ্বিতীয় বিয়েটি ন্যায়সঙ্গত এবং তারা যদি উভয় পক্ষের শুনানি শেষে সম্মতি দেয়; ইত্যাদি।

যদি কোনো পুরুষ এই আইন অমান্য করে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বা সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তিনি নিম্নলিখিত শাস্তির সম্মুখীন হতে পারেন:

  • কারাদণ্ড: এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
  • জরিমানা: ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
  • উভয় দণ্ড: আদালত কারাদণ্ড ও জরিমানা উভয় দণ্ডই দিতে পারে।

মনে রাখবেন, ধর্মীয় বিধান থাকলেও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন আপনার ব্যক্তিগত অধিকার ও পারিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এছাড়া ধর্মীয় বিধানও ইচ্ছে হলেই পুরুষকে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য উৎসাহিত করে না। সেখানেও মানতে হবে কিছু সুনিদির্ষ্ট শর্ত। যেমন, আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য থাকা; প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার বজায় রাখা, ইত্যাদি। আপনার করণীয়- মনে রাখবেন, আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপনও ভিন্ন হবে। আপনার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যাগুলোর সঠিক আইনি সমাধান পেতে, কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top