বিয়েতে প্রাপ্ত সোনাদানা উপহার সামগ্রী; তালাক হলে, সেগুলোর কী হবে?

বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তন্বীর সাজানো সংসারটা ভেঙে গেল। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি শান্ত স্বভাবের অথচ হাসি-খুশিতে থাকা একটা মেয়ে। জানি না, মেয়েটার জীবনটা ঠিক কোথায় হোঁচট খেল। তবু, তার সংসার ভাঙনের পর একটা কথাই সবার মুখে আলোচিত হচ্ছিল- বিয়ের সময় পাওয়া এতো এতো সোনা-গয়না, আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টিভি আর দামি গাড়িটা- সেগুলোর কী হবে?

একমাত্র মেয়ে। তাই বাবা-মা কষ্ট করে হলেও মেয়ে-জামাইকে খুশি রাখতে উপহারগুলো দিয়েছিলেন। শ্বশুরবাড়ির লোকও কম দেননি। উপহারগুলো ভালোবাসার প্রতীক ছিল, কিন্তু এখন সেগুলি যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা। সেগুলো বন্দি হয়ে আছে শ্বশুরবাড়ির লকারে। জিনিসগুলো কি ফেরত পাওয়া যায় না?

স্বামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হলো, উপহারের বেশিরভাগই তারা দিয়েছেন, তাই তালাকের পর সেগুলো তাদেরই সম্পত্তি থাকবে। স্ত্রীর বাবা-মাও বলতে শুরু করলেন, মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে তারা যা দিয়েছিলেন, তা তাকে ফেরত দিতে হবে। এদিকে, বিয়েতে পাওয়া অন্যান্য উপহারও স্বামীর বাড়ি থেকে কিছুতেই নিয়ে আসা যাচ্ছে না। আর সোনাদানার প্রায় পুরোটাই স্বামীর বাড়ির লকারে বন্দি হয়ে গেছে। তারা তা দিতে চাইছেন না।

আসলে, তন্বীর মতো এমন হাজারো মানুষ আছেন, যারা সম্পর্কের টানাপোড়েনে আইনি অধিকারের কথা ভুলে যান অথবা জানতেই পারেন না। তালাক, একটি দাম্পত্য জীবনের ইতি টানলেও, আর্থিক এবং বস্তুগত অধিকারগুলোর সঠিক নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।

বিশেষ করে, বিয়ের সময় দেওয়া, ও বিয়েতে পাওয়া উপহারগুলো নিয়ে যখন দু’পক্ষই পরস্পরের দিকে আঙুল তোলে, তখন পুরো বিষয়টিই এক জটিল আইনি ধাঁধায় পরিণত হয়। এই পরিস্থিতিতে আইন কী বলে? সেই উপহারের মালিকানা আসলে কার? চলুন, আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি জটিলতাটির সহজ সমাধান জেনে নেওয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা: তালাকের পর উপহারের মালিকানা
বিয়ের সময় দেওয়া উপহারের মালিকানা নির্ভর করে উপহারটি কে, কাকে এবং কী উদ্দেশ্যে দিয়েছেন তার ওপর। তবে, সাধারণ ধারণা ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে:

১. স্ত্রীকে দেওয়া উপহার (স্ত্রীধন বা স্ত্রীর সম্পত্তি): স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে স্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে যে গয়না, পোশাক বা উপহার দেওয়া হয়, তা ‘স্ত্রীধন বা স্ত্রীর সম্পত্তি’ হিসেবে গণ্য হয়। এই স্ত্রীধনের ওপর স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার থাকে এবং তালাকের পরও তিনি এর মালিক থাকেন। স্বামী বা তার পরিবার এগুলো ফেরত চাইতে পারেন না।

২. পারিবারিক উপহার: যদি কোনো উপহার যৌথভাবে ব্যবহার বা পরিবারকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয় (যেমন আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, গাড়ি) এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে পাওয়া অন্যান্য উপহার সামগ্রী সে ক্ষেত্রে তালাকের পরিস্থিতি অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে এর ন্যায্য ভাগ বা মালিকানা নির্ধারণ করা হতে পারে।

৩. যৌতুক হিসেবে প্রাপ্তি: যৌতুক দেওয়া বা নেওয়া দুটোই বাংলাদেশে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যৌতুক হিসেবে প্রাপ্ত কোনো বস্তু বা অর্থের বৈধ মালিকানা দাবি করাও আইনত সিদ্ধ নয়। এমন কিছু ঘটলে উল্টো তিনি নতুন একটি ফৌজদারি অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হবেন।

আপনার করণীয়- মনে রাখবেন, আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপনও ভিন্ন হবে। আপনার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যাগুলোর সঠিক আইনি সমাধান পেতে, কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top