“স্যার, আমি ওকে ধরে রাখতে গিয়ে, নিজের জীবনটাকেই শেষ করে ফেলেছি। কথাগুলো বলছিলেন, মাহমুদা বেগম। তার দু’চোখ জুড়ে ক্লান্তি; তিনি সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, এখন বুঝেছি, আমি কোনটা ভুল করেছি আর সেই ভুলের খেসারত এখন আমাকেই বইতে হচ্ছে। সবকিছু আমার হাতের নাগালেই ছিল। অথচ আমিই আজ শিকারে পরিণত হলাম!”
এটা মাহমুদা বেগমের একার গল্প নয়। বাংলাদেশে অসংখ্য নারী স্বামী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে আতঙ্ক, ভয়, লজ্জা, রাগ এবং একাকিত্বের চাপে এমন কিছু ভুল করেন, যা পরবর্তীতে তাদের আইনি অবস্থানকেও দুর্বল করে দেয়।
আর কেউ যেন সেই ভুলগুলো না করেন, তাই আজ তুলে ধরছি খুব সাধারণ কিছু ভুল। হয়তো মিলেও যেতে পারে কারো সাথে।
১) আবেগে হঠাৎ সব প্রমাণ মুছে ফেলা। অনেকে দুঃখ, রাগ, অপমান বা মানসিক চাপে চ্যাট ডিলিট করে দেন, স্ক্রিনশট নেন না, ভয়েস ক্লিপ মুছে ফেলেন, কিন্তু মামলায় প্রমাণই সবকিছু। আবেগের মুহূর্তে ডিলিট করা, নিজের শক্তিশালী অস্ত্র নষ্ট করা। (যদিও এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে যথাযথ উপায়ে।)
২) স্বামীকে জেরা করতে গিয়ে নিজের বিরুদ্ধে অপরাধ করে ফেলা। অনেকে ব্যথায় ভুল পথে চলে যান, স্বামীর ফোন ভেঙে ফেলা, জোর করে কেড়ে নেওয়া, গোপনে রেকর্ড করা, লুকানো ক্যামেরা স্থাপন করা, এসবই আইনগত অপরাধ (Unauthorized Access/Privacy Violation)। পরকীয়ার মামলায় প্রমাণ না পাওয়ার পাশাপাশি উল্টো আপনিই অভিযুক্ত হতে পারেন।
৩) পরিবারের সবাইকে বলে ফেলেন, কিন্তু আইনজীবীকে বলেন না বা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। এটাই সবচেয়ে সাধারণ ভুল। পরিবারে মা, ভাবি, ননদ বা বান্ধবী অথবা প্রতিবেশী, সবাইকে বলা হয়, কিন্তু একজন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীকে বলা হয় না। ফলে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
৪) স্বামীর সাথে ঝগড়া করে প্রমাণ নষ্ট করে ফেলা। মাঝে মাঝে আবেগে ঝগড়া এত তীব্র হয়, স্বামী বুঝে যায়, তখন সে সুযোগ বুঝে চ্যাট মুছে ফেলেন, নম্বর ব্লক করেন, ফোন রিসেট দেন অথবা অ্যাপ ডিলিট করে। ফলে, যে প্রমাণ আদালতে কাজে আসতো, সব হারিয়ে যায়।
৫) ভুল সময় ভুল পরামর্শ গ্রহণ করা। অনেকে বলেন, ‘চুপ থাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে’ ‘সন্তানের কথা ভাবো’ ‘মেয়ে মানুষ বেশি জানলে সংসার ভাঙে’ কিন্তু অনেক সময় নীরবতা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। মনে রাখবেন, পরামর্শ নেওয়ার সঠিক জায়গা হলো- আইন, মনোবিজ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় দক্ষ মানুষ।
৬) নিজের অধিকার সম্পর্কে কিছুই না জানা। অনেক নারী জানেনই না যে, তার স্বামীর পরকীয়ার অপরাধে কি কি অধিকার সৃষ্টি হয়েছে। পৃথক বসবাস, তালাক, ভরণপোষণ, খোরপোশ, মোহরানা ইত্যাদি সবকিছুতেই তার অধিকার রয়েছে এবং সেগুলো জোড়ালো হয়ে ওঠে। তবে, মনে রাখবেন, এগুলো সর্বশেষ প্রতিকার। শুধু জেনে রাখুন। কেননা, অজ্ঞতা হলো সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
সিংহভাগ ক্ষেত্রে যে বড় ভুলটি অনেক নারী করেন, তা হলো, অকারণ সন্দেহ। একটি যোগাযোগ কখন পরকীয়া, কখন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, আর কখন নিছক সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ, এই সূক্ষ্ম সীমারেখাটি টানতে গিয়ে অনেকেই ভুল করেন।
আরেকটি ভুল হয়, একজন জীবন্ত মানুষকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে রাখার চেষ্টা করা। তারা ভুলে যান, সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাসে, নিয়ন্ত্রণে নয়।