কতটুকু নির্যাতিত হলে প্রতিকার পেতে পারেন একজন নারী?

তিনি জানতেন না, অদৃশ্য ক্ষতগুলো আসলে মনের ভেতরে তৈরি হচ্ছিল প্রতিনিয়ত! তা শারীরিক আঘাতের চেয়েও কতটা মারাত্মক হতে পারে। তিনি ভেবেছিলেন, নির্যাতন মানে শুধুই আঘাতের চিহ্ন, শুধুই ক্ষতবিক্ষত হওয়া। হ্যাঁ একথা সত্যি, স্বামী কখনো তার গায়ে হাত তোলেনি, কিন্তু তার মুখ থেকে রোজ বের হতো কটু কথা, গালিগালাজ আর চরম অপমান।

এমনকি আত্মীয়-স্বাজন বন্ধু-বান্ধবদের সামনেও তাকে হেয় হতে হয়েছে বহুবার। আত্মসম্মান বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না তার। তবু তিনি ভাবতেন, স্বামী তো তাকে মারেনি, তাহলে কিভাবে তিনি নারী নির্যাতনের শিকার হলেন?

কথাগুলো গল্প করার ছলে এসেছে আমার কানে। আমি আশ্চর্য হয়নি মোটেও। আমাদের সমাজে বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন যে, নারী নির্যাতন মানেই কেবল শারীরিক আঘাত, মারধর বা অ্যাসিড নিক্ষেপ? শিকার আর শিকারী দু’জনেই একইভাবে ভাবছেন কথাগুলো আর নিজের অজান্তেই একটা দুর্বিসহ জীবনকে মেনে নিয়ে, সে জীবন যাপন করে চলছেন নিত্যদিন।

আমাদের দেশের অনেক নারীই স্বামীর মানসিক চাপ, আর্থিক বঞ্চনা বা চরম অবহেলাকে নীরবে সহ্য করেন, এই ভেবে যে, শরীরে আঘাতের দাগ নেই, তাই হয়তো তারা আইনত কোনো প্রতিকার পাবেন না। এই ভুল ধারণা বহু নারীকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

তাহলে আইন কী বলছে? আমাদের দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কি শুধু মারধরের কথা বলা হয়েছে? চলুন, এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংজ্ঞাটি পরিষ্কার করে জেনে নেওয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা: শারীরিক বনাম মানসিক নির্যাতন
সাধারণত মানুষ ‘নারী নির্যাতন’ বলতে শুধু শারীরিক আঘাতকে বোঝে। তবে বাংলাদেশের আইন নারীর প্রতি মানসিক ও আর্থিক নিষ্ঠুরতাকেও নির্যাতন হিসেবে গুরুত্ব দেয়:

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত): এই আইনে সরাসরি ‘মানসিক নির্যাতন’ শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও, যৌতুকের জন্য চাপ দেওয়া, অপমান করা বা গুরুতর মানসিক কষ্ট দেওয়াকে অন্যান্য নির্যাতনমূলক কাজ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-
এই আইনটি মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে শক্তিশালী। এই আইনের  ধারা ২(গ) অনুযায়ী ‘পারিবারিক সহিংসতা’: এর সংজ্ঞায় শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন এবং আর্থিক নির্যাতনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মানসিক নির্যাতনের ব্যাখ্যা: এই আইনে মানসিক নির্যাতন বলতে মৌখিক গালিগালাজ, অপমান, ভয় দেখানো, অবহেলা এবং আবেগগত কষ্ট দেওয়াকে বোঝানো হয়েছে। যারা গালিগালাজ বা অপমানের শিকার, তারা এই আইনের অধীনে সুরক্ষা চাইতে পারেন।

মূল বার্তা: নারীকে শারীরিক, মানসিক, আর্থিক বা যৌন- যে কোনো প্রকারের কষ্ট বা ক্ষতি দেওয়া হলে তা আইনত নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে। যার আইনগত প্রতিকার সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত।

আপনার জন্য পরামর্শ-
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপনও ভিন্ন হবে। মানসিক নির্যাতনের প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে (যেমন: মেসেজ, রেকর্ডিং বা সাক্ষ্য)। সঠিক আইনি পদক্ষেপ নিতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top