“স্ত্রী যদি তার স্বামীকে তালাক দেন, তাহলে নাকি দেনমোহর পাওয়া যায় না” – এই একটি ভুল আইনি ধারণা সমাজে শত শত নারীকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।
গতকাল ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা বলি। খুব বেশি দিন হয়নি আয়েশা বেগমের বিয়ে হওয়ার। মাত্র চার বছরের সংসার। এই ক’টা বছর সংসার করার পর, স্বামীর নিত্যদিনের চরম অবহেলা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সম্প্রতি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আয়েশার একমাত্র বাধা ছিল তার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কথা- “তুই যদি নিজে তালাক দিস, তবে একটা টাকাও দেনমোহর পাবি না। সব টাকা মাফ হয়ে যাবে।”
আয়েশা বেগম বিগত চার বছর ধরে এই মিথ্যে ভয়ের কারণে সীমাহীন অত্যাচার সহ্য করেছেন। একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়, তাকে নিস্তব্ধ করে রেখেছে। সত্যি সত্যিই তো, আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো মনে করেন, তালাক বা বিচ্ছেদের আবেদন স্ত্রীর পক্ষ থেকে এলে স্বামী দেনমোহর দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি পান।
আইনগত সত্য কী? চলুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর হলো স্ত্রীর একটি আইনি অধিকার এবং স্বামীর জন্য তা পরিশোধ করা ‘বাধ্যতামূলক ঋণ’। এটি বিচ্ছেদের উপর নির্ভর করে না। আরও সহজভাবে বললে, দেনমোহর বা মোহরানা, বিবাহের সাথে সম্পর্কিত, তালাকে সাথে নয়। নিচে তালাকের প্রকার ও তার সাথে দেনমোহরের সম্পর্ক আলোচনা করা হলো-
তালাক-ই-তাফওয়ীজ: বিবাহ রেজিষ্ট্রেশনের সময় কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে, স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দিয়ে থাকেন এবং সেই ক্ষমতার বলে স্ত্রী যদি বিচ্ছেদ চান, তবে তিনি অবশ্যই সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি করার অধিকারী। এক্ষেত্রে তিনি নিজে উদ্যোগ নিলেও তার দেনমোহরের অধিকার এক চুলও কমে না।
আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ: যদি স্ত্রী ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের অধীনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে (যেমন: নির্যাতন বা ভরণপোষণ না দেওয়া, ইত্যাদি) আদালতে মামলা করে বিচ্ছেদ পান, তবুও স্বামী সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য।
ব্যতিক্রম-
খুলা বা খোলা তালাক: একমাত্র ‘খুলা’ তালাকের ক্ষেত্রে (যেখানে স্ত্রী স্বামীকে কিছু ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে বিচ্ছেদে রাজি করান) দেনমোহরের আংশিক বা পুরোটা মওকুফ হতে পারে। তবে সেটি অবশ্যই স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতিতে হতে হবে, কোনো চাপ সৃষ্টি করে নয়।
মনে রাখবেন: দেনমোহর কোনো দয়া বা দান নয়, এটি বিয়ের সময় হওয়া চুক্তির অংশ। স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক দিলেই দেনমোহর মাফ হয়ে যায়- এই ধারণা আইনত ভুল এবং ভিত্তিহীন। প্রচলিত এই বিভ্রান্তিগুলো হাজারো নারীর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। তাই সঠিক নিয়মগুলো নিজে জানতে হবে, অন্যকেও জানাতে হবে।