স্বামীর পরকীয়া সঙ্গীর বিরুদ্ধে কি মামলা করা যায়?

পরকীয়া আক্রান্ত স্বামীর সাথে যে নারী জড়িত, তাকে শায়েস্তা করা যায় কীভাবে? এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে প্রায়শই হতে হচ্ছে। এর আগের বিভিন্ন লেখায় উত্তরটা এসেছিল অনেকবার। আজ শুধু সেই উত্তরটা নিয়ে আলোচনা করবো।

বাংলাদেশের আইনে দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী, “যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে সেই নারীর সম্মতি সাপেক্ষে তার স্বামীর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হন, তবে সেই ব্যক্তি ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।” সংজ্ঞাটির সারমর্ম হলো এটাই।

আসুন সংজ্ঞাটিকে বিশ্লেষণ করি। এই সংজ্ঞার কত মারাত্মকভাবে নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে দেখুন-

সংজ্ঞা অনুসারে, নারী যদি তার স্বামীর অনুমতি নিয়ে অন্য পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তবে তা ব্যভিচার (পরকীয়া) হবে না! একই সাথে, এই আইনে অপরাধী নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেয়া যাবে না বা শাস্তি দেয়া যাবে না!

কারণ, নারী এখানে ইন্সট্রুমেন্ট (Instrument)! নারীর মানবিক সত্তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে এই সংজ্ঞায়। কেউ কেউ নারীকে ভিকটিম বলতে চেয়েছেন। যদি নারী ভিকটিম হয়, তবে প্রথম ব্যাখ্যাটা খেয়াল করুন। স্বামীর অনুমতি নিলে সব বৈধ!

সুতরাং পরিস্কারভাবে আবারও বলছি। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারায়, কার বিরুদ্ধে মামলা হয়? অভিযুক্ত করা হয় “পরকীয়ায় জড়িত পুরুষকে” যদি তিনি, বিবাহিত নারীর সঙ্গে, তার স্বামীর সম্মতি ছাড়াই, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তাহলে পুরুষটি ৪৯৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য।

তৃতীয় নারী, যে নারী পরকীয়ায় জড়িত, ৪৯৭ ধারায় কোনো শাস্তির আওতায় পড়েন না। ধারাটি নারীদের “ভিকটিম” হিসেবে ধরে, অপরাধী নয়। তাই তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। এমনকি তাকে এই অপরাধের বা অপকর্মের সহযোগী হিসেবেও ধরার উপায় নেই, সহযোগী হিসেবেও তার বিরুদ্ধে মামলায় অন্তর্ভূক্ত করা যায় না!

আর স্ত্রী কীভারে মামলা করবেন, যিনি তার স্বামীর সঙ্গীকে শায়েস্তা করার চেষ্টা করছেন? উত্তর হলো, না, স্ত্রী তার স্বামী বা স্বামীর সঙ্গিনী, কাউকেই ৪৯৭ ধারায় অভিযুক্ত করতে পারবেন না।

কেন?
কারণ ৪৯৭ ধারা তৈরি করা হয়েছে শুধু সেই পুরুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য, যিনি অন্যের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক করেন। স্ত্রীর স্বামী এখানে “অন্যের স্ত্রী” বিভাগে পড়ে না।

তারপরও স্ত্রী কী কী আইনি প্রতিকার পেতে পারেন পরকীয়া আক্রান্ত স্বামীর স্ত্রী? সেটাও বলা হোক।
ভরণপোষণ মামলা, স্বামীর অবহেলা, ব্যভিচার, সহায়তা না করা, সবই ভরণপোষণ দাবির শক্ত কারণ। মোহর আদায়, পরকীয়ার কারণে দাম্পত্য শারীরিক বা মানসিক ভাঙন হলে স্ত্রী মোহর আদায়ে মামলা করতে পারেন।

দাম্পত্য অধিকার লঙ্ঘন: স্বামীর নিষ্ঠুর আচরণ প্রমাণিত হলে তালাক বা খোলা তালাক অথবা বিচ্ছেদের আইনি পথ খোলা। (যা নারীকে আরও অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়)

মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন- নারী নির্যাতন আইন ২০০০, যদি পরকীয়ার কারণে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন ঘটে তবে।

এছাড়াও সালিস ও সামাজিক মীমাংসা, পরিবারিক আদালতের বাইরে আরেকটি বাস্তবসম্মত পথ। তবুত বাস্তবতা হলো, এই প্রতিকার নিরপরাধ একজন নারীকে অপরাধী নারীটির চেয়ে লক্ষগুণ বেশি অসহায় করে তোলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top