স্বামী অন্য সম্পর্কে লিপ্ত? বিচ্ছেদই কি একমাত্র সমাধান নাকি আছে আরও পথ?
সংসারের সুখ-শান্তি যখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির আগমনে বিষিয়ে ওঠে, তখন একজন স্ত্রীর মানসিকভাবে ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক। অনেক নারী মনে করেন, স্বামী পরকীয়া করলে হয়তো মুখ বুজে সহ্য করতে হবে, না হয় ডিভোর্স দিতে হবে। কিন্তু আইন আপনাকে আরও অনেকগুলো বিকল্প পথ দিয়েছে যা হয়তো আপনার অজানাই রয়ে গেছে।
বাস্তব একটি ঘটনা শুনুন। এক নারী ক্লায়েন্টের কথা বলছি। বেশ কিছুদিন আগের কথা। তার থেকে মূল ঘটনাটা শেয়ার করছি আপনাদের জন্য। ভদ্রমহিলার স্বামী তাকে ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে অন্য এক নারীর সাথে বসবাস শুরু করেছিলেন। সেই নারী ডিভোর্স চাননি, কারণ তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন ছিল।
ছিল আত্মীয় স্বজনদের চোখ রাঙ্গানি আর ‘যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না তার’! তিনি জানতে চেয়েছিলেন, “বিচ্ছেদ ছাড়াও কি আমি আমার অধিকার আদায় করতে পারি?” আমি তাকে আইনি পথের দিশা দিয়েছিলাম এবং আজ তিনি তার সন্তানদের নিয়ে মাথা উঁচু করে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পেরেছেন।
স্বামীর পরকীয়ার ক্ষেত্রে আপনার জন্য আইনি পথগুলো কী কী?
১. ভরণপোষণ বা খোরপোষ দাবি: স্বামী পরকীয়ায় লিপ্ত থাকলেও তিনি আপনাকে এবং আপনার সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে আইনত বাধ্য। যদি তিনি অবহেলা করেন, ভরণপোষণ দিকে অস্বীকার করেন, তবে আপনি পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণের মামলা করতে পারেন। বিচ্ছেদ না করেও আপনি আপনার মাসিক খরচ আদায়ের অধিকার রাখেন।
২. দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলা: স্বামী যদি অন্য সম্পর্কের টানে আপনার থেকে দূরে থাকেন বা ঘরসংসার না করেন, তবে আপনি পারিবারিক আদালতে ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’ (Restitution of Conjugal Rights) মামলা করতে পারেন। আদালত তখন তাকে আপনার সাথে সংসার করার আইনি নির্দেশ দিতে পারেন।
৩. বিনা অনুমতিতে বিয়ে করলে আইনি ব্যবস্থা: পরকীয়ার জেরে স্বামী যদি আপনাকে না জানিয়ে বা আপনার অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে সেটি মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে আপনি স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন, যাতে তার জেল বা জরিমানার বিধান রয়েছে।
৪. দেনমোহর আদায়: যদি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিচ্ছেদ অনিবার্য, তবে আপনি আপনার সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি করতে পারেন। এমনকি বিচ্ছেদ না হলেও স্ত্রী যেকোনো সময় তার ‘উসুল’ বা তলবি দেনমোহর দাবি করার আইনি ক্ষমতা রাখেন; যদি তা অপরিশোধিত থাকে।
এতো কিছুর পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আপনাদের জানাতেই হবে:
মনে রাখবেন-
আদালত কাউকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারে না; এবং
পরকীয়া (সমাজের চোখে যে যোগাযোগগুলোকে পরকীয়া হিসেবে চিহ্নত করা হয়) বন্ধের সরাসরি আদেশ দেয় না। তবে আইন স্ত্রীর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তাইতো, নিজের অধিকার জানা মানে সম্পর্ক ভাঙা নয়, বরং নিজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আইনজীবীর বিশেষ পরামর্শ:
আইন সবার জন্য সমান হলেও প্রতিটি ঘটনার ধরণ ও পারিপার্শ্বিকতা ভিন্ন হয়। তাই লোকলজ্জার ভয়ে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না। কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আপনার অধিকারগুলো ভালোভাবে বুঝে নিন। মনে রাখবেন, সঠিক আইনি পরামর্শ আপনার জীবনকে একটি সুন্দর ও নিরাপদ পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।