জীবিত বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে সন্তানের অধিকার কতটুকু?

একটা মারাত্মক ভুল ধারণার কথা শেয়ার করছি আজ…

কিছুদিন আগের ঘটনা। হন্তদন্ত হয়ে একজন চেম্বারে এলেন। অনলাইন থেকে আমার চেম্বারের ঠিকানা যোগার করেছেন। তিনি তার বাবার বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইছেন। “আমার বাবা তার সম্পত্তি আমাকে লিখে দিচ্ছেন না! আমার যেটুকু সম্পত্তি পাবার কথা, সেই অংশটা আমার চাই, এখনই চাই। আমার বাবার সম্পত্তি তো আমারই উত্তরাধিকার!”

আমি অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার বাবা কি জীবিত আছেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, বাবা-মা দু’জনেই জীবিত এবং সুস্থই আছেন।” তার এই উত্তর শুনে আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের সমাজে পিতা-মাতার সম্পত্তিতে সন্তানের অধিকার নিয়ে কতটা ভুল ধারণা প্রচলিত। অনেকেই মনে করছেন, বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে তাদের অধিকার সকল সময়-ই আছে, তাদের জীবিত বা মৃত অবস্থার কোন ভূমিকা নেই।

এই ভুল ধারণার কারণে প্রায়শই অসংখ্য পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। সন্তানরা জীবিত বাবা-মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সম্পত্তি ভাগ করে নিতে চায়, যা শুধু আইনগতভাবে ভুল নয় বরং সামাজিক ও নৈতিকভাবেও নিন্দনীয়। মনে রাখবেন, তারা যতক্ষণ জীবিত আছেন, তাদের সম্পত্তিতে আপনার কোনো অধিকার নেই। আপনার বাবা-মা তাদের সম্পত্তি কাকে দেবেন, কখন দেবেন, তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আপনার কাজ শুধু তাদের সেবা করে যাওয়া।

জীবিত ব্যক্তির সম্পত্তিতে সন্তানের অধিকার: আইন কী বলে?

বাংলাদেশের প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী এবং মুসলিম ফরায়েজ অনুসারে, জীবিত ব্যক্তির কোনো উত্তরাধিকার সৃষ্টি হয় না। এর অর্থ হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি জীবিত থাকেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সম্পত্তিতে তার সন্তানদের বা অন্য কারো কোনো ধরনের আইনগত অধিকার জন্মায় না।

পূর্ণ মালিকানা: আপনার বাবা-মা তাদের সম্পত্তির পূর্ণ মালিক। তারা তাদের সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন, দান বা হেবা করতে পারেন, উইল করতে বা অন্য যে কোনো ভাবে হস্তান্তর করতে পারেন। সন্তান হিসেবে আপনি তাদের এই কাজে বাঁধা দিতেও পারবেন না।

মৃত্যুর পরই উত্তরাধিকার: কেবল বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরই তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ফরায়েজ (মুসলিম উত্তরাধিকার আইন) অনুযায়ী তাদের সন্তানদের এবং অন্যান্য ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টিত হবে।

জীবিত অবস্থায় পীড়াপীড়ি: বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় তাদের সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া বা পীড়াপীড়ি করা আইনত বা ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কখনও কখনও তা ফৌজদারি অপরাধও সৃষ্টি করতে পারে! মনে রাখবেন, সম্পত্তি নিয়ে বাবা-মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করা শুধু পারিবারিক সম্পর্কই নষ্ট করে না, এটি একটি গুরুতর নৈতিক স্খলনও বটে।

আইনি পরামর্শ: সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন। আপনার বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান দেখান এবং তাদের সম্পত্তির ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করবেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top