যে রশিদ আপনার বিবাহিত স্ত্রীর কাছ থেকে নিতে হবে!

আইন সহায়িকা ব্যানার। “যে রশিদ আপনার বিবাহিত স্ত্রীর কাছ থেকে নিতে হবে!” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল

”বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল। স্ত্রীর হাসিমুখটা দেখার জন্য আমি সব কিছু করতে প্রস্তুত ছিলাম। আমার দেনমোহর ছিল পাঁচ লক্ষ টাকা, যার মধ্যে ৫০,০০০ টাকা বিয়ের সময় গহনাবাবদ পরিশোধ করেছিলাম। বাকি টাকাটা বছর খানেকের মধ্যেই নগদে পরিশোধ করে দিয়েছিলাম এবং বলেও ছিলাম, প্রতিমাসের বেতন থেকেই আমি তা পরিশোধ করছি।

তখন আমি ভাবিনি যে, নিজের স্ত্রীর কাছ থেকে এসবের প্রমাণ রাখতে হয়। কারণ নিজের ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে হিসাব কষে চলাটা আমার কাছে খুবই দৃষ্টিকটু মনে হয়েছিল। সম্পর্ক তো বিশ্বাস আর ভালোবাসার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। কিন্তু একদিন আমার সেই ধারণা ভেঙে গেল, সংসারটা ভেঙ্গে যাবার আগেই!

আমাকে অবাক করে দিয়ে, আমার স্ত্রী দেনমোহরের বাকি টাকা দাবি করে আদালতে মামলা দায়ের করল। আমি কিছুতেই প্রমাণ করতে পারছিলাম না যে আমি তাকে সব টাকা পরিশোধ করেছি।”

– কয়েকদিন আগে আমার এক মক্কেলের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো। কথাগুলো হয়তো অনেকের জীবনের সাথেও মিলে যাবে।

আমাদের সমাজে এটি একটি সাধারণ ভুল। স্বামীরা দেনমোহর পরিশোধ করেন কিন্তু কোনো প্রমাণ রাখেন না। তারা মনে করেন, নিজের স্ত্রীর সঙ্গে এসবের লেনদেন রাখাটা ভালোবাসার প্রতি অমর্যাদা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

যদি কোনো কারণে আপনার দাম্পত্য জীবনে জটিলতা দেখা দেয় এবং মামলা-মোকদ্দমা হয়, তখন আপনার এই ভালোমানুষীই আপনার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। একজন অ্যাডভোকেট হিসেবে আমি দেখেছি, প্রমাণের অভাবে অসংখ্য স্বামী দেনমোহরের টাকা দুবার পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

দেনমোহর পরিশোধের আইনগত দিক-
আইন অনুযায়ী, দেনমোহর স্ত্রীর একটি আইনি অধিকার এবং এটি অবশ্যই স্বামীকে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু যদি স্বামী তা পরিশোধ করার পরও কোনো প্রমাণ না রাখেন, তাহলে তিনি বিপদে পড়তে পারেন।

দাবির প্রমাণ: দেনমোহর পরিশোধের দায়িত্ব স্বামীর। যদি স্ত্রী দাবি করেন যে দেনমোহর পরিশোধ করা হয়নি, তবে স্বামীকে তা প্রমাণ করতে হবে যে তিনি দেনমোহর পরিশোধ করেছেন।

প্রমাণের গুরুত্ব: দেনমোহর পরিশোধের যেকোনো ধরনের প্রমাণ, যেমন – লিখিত রসিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চেক বা একাধিক সাক্ষীর উপস্থিতি আদালতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মৌখিক দাবি বা স্রেফ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।

দৃষ্টিকটু নয়, দায়িত্ব: দেনমোহর একটি চুক্তিভিত্তিক বিষয়। এটিকে শুধুমাত্র আবেগের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, এর আইনি দিক সম্পর্কে সচেতন থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। এমনকি এটাও মনে রাখা দরকার, মুসলিম বিবাহ একটি দেওয়ানি চুক্তি!

মনে রাখবেন, দাম্পত্য জীবনের মধুরতা যেন আপনার আইনি অধিকারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না দেয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ যদি যথাযথভাবে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, তাহলে অনেকের পক্ষেই বিয়ের সময়ই সেটা পরিশোধ করা সম্ভবপর হয়; এবং সেটাই করা উচিত।

আপনার করণীয়-
দেনমোহর সংক্রান্ত কোনো জটিলতায় একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন। চেষ্টা করুন, দেনমোহর বা এর কোনো অংশ পরিশোধ করার সময় অবশ্যই লিখিত রসিদ বা যেকোনো ধরনের প্রমাণ সংগ্রহে রাখতে।

আর যদি অতিরিক্ত সংকোচ বোধ করেন, তবে এই প্রতিবেদনটা শেয়ার করুন তার কাছে। অথবা সেভ করে রাখুন। সেও বুঝতে পারবে এবং ভবিষ্যতেও কাজে দিবে।

Share the Post:
Scroll to Top