ছয় বছরের ফুটফুটে বাচ্চাটি হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে, এরপর তার জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে…
কিছুদিন আগের একটি ঘটনা। এক দম্পতি এসেছিলেন চেম্বারে। সাথে ছয় বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে। আট বছরের সংসার তাদের। এই দীর্ঘ আট বছর-ই তারা নানান সময়ে ঝগড়া-বিবাদ আর ভুল বোঝাবুঝির মধ্যেই সংসার করেছেন। এমনকি তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও। অথচ তাদের সমস্যা শুরু হয়েছিল বিয়ের প্রথম বছর থেকেই। ঠিক প্রথম বছর নয়; বলতে গেলে বিয়ের প্রথম রাত থেকেই।
এবং আশ্চর্য হলে সত্য, দু’জনেই ভেবেছেন, “একটা সন্তান হলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।” তাদের সেই সন্তানও হলো, কিন্তু সম্পর্কের বাঁধন ঠিক হবার বদলে আরও আলগা হলো। ফাইনালি, এখন তারা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অবুঝ বাচ্চাটি হয়তো বুঝে গেছে, কী হতে যাচ্ছে তার জীবনে! সে একবার তার বাবার দিকে তাকায়, আবার মায়ের দিকে তাকায়- তার চোখে রাজ্যের ভয়। হয়তো সে জানার চেষ্টা করছে, এরপর তার জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
এই ঘটনাটি আমাকে শুধু আবেগপ্রবণ করে না, বরং মনে করিয়ে দেয়, বিচ্ছেদ কেবল একটা পরিণতি নয়, এই পরিণতিরও হাজারটা পরিণতি থাকে। আর যদি সন্তানাদি থাকে, তো আরও কিছু মানুষের জীবন পড়ে যায় চরম অনিশ্চয়তায়। যদিও আমাদের সমাজে অনেকেরই ধারণা, সন্তান জন্ম নিলে দাম্পত্য কলহ মিটে যায়।
যা হোক, যদি স্বামী-স্ত্রীর মনের মিলই না থাকে, তবে সন্তান শুধু সেই ভাঙা সম্পর্কের নীরব সাক্ষী হয়ে যায়। শুধু শুধু আরও কিছু জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করা হয়। তাই যদি সত্যি সত্যিই মনে হয় সংসার করা অসম্ভব, তবে দ্রুত এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বিচ্ছেদ, সন্তান ও আইন: এর পরিণতি কী?
বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক একটি আইনি প্রক্রিয়া হলেও এর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি সুদূরপ্রসারী, বিশেষ করে যখন সন্তান জড়িত থাকে।
শিশুর মানসিক আঘাত: সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ বা নিত্যদিনের ঝগড়া তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেক সময় এর ফলে সন্তানের মধ্যে অপরাধবোধ বা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সন্তানের অভিভাবকত্ব (Custody): বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বড় আইনি জটিলতা তৈরি হয় সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সন্তানের হেফাজত মায়ের কাছে থাকে, কিন্তু ভরণপোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ বাবার থাকে। সন্তানের কল্যাণ বিবেচনা করেই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।
একটি একান্ত ব্যক্তিগত পরামর্শ: যদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব মনে হয়, তবে উত্তম হয় (এবং যদি সম্ভব হয়) সন্তান জন্মাবার আগেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। এর ফলে অন্তত একটি নির্দোষ জীবনকে ভয়াবহ মানসিক চাপ থেকে রক্ষা করা যায়। অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্ত রাখা যাবে।
মনে রাখবেন, ভালোবাসা না থাকলে সন্তান জন্ম দেওয়া সমস্যার সমাধান নয় বরং সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে। একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য স্বামী-স্ত্রীর সুস্থ মানসিক বন্ধন অপরিহার্য।
[উপরোক্ত আর্টিকেলটির অনেকাংশ ব্যক্তিগত অভিমত ও অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। হয়তো কারো কারো মতের সাথে নাও মিলতে পারে। বিরুদ্ধ মত থাকাই স্বাভাবির। আপনি চাইলে সেগুলো কমেন্টে শেয়ার করতে পারেন। আপনার জন্য সাধুবাদ রইল।]