বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?

মৌলভী সাহেবের কাছে বিয়ে পড়ানোর পর স্বামী বললেন, “এখনই রেজিস্ট্রি করার কী দরকার? পরে একসময় করলেই হবে।” সহজ-সরল রিমা খাতুন সেই কথায় বিশ্বাস করলেন। গ্রামের মেয়ে রিমা খাতুনের বিয়েটাও হয়েছিল খুবই সাদামাটাভাবে।

মৌলভী সাহেব এসেছিলেন, সাক্ষী ছিলেন, দোয়া-দরুদ পড়ে কবুলও বলা হল। সবকিছুই তো একদম বৈধভাবে এবং শতভাগ ঠিকঠাক-ই হল। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

সমস্যা হলো, পরে এক সময় করা হবে বলে আর তার বিয়েটা রেজিস্ট্রি করা হয় নাই। বছর পাঁচেক পর তাদের সংসারে যখন চরম অশান্তি শুরু হলো, স্বামী রিমা খাতুনকে তার স্বামী বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।

সে যখন দেনমোহর, ভরণপোষণ আর খোরপোষের অধিকারের জন্য আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলেন, তখনই এক কঠিন সত্যের মুখে পড়লেন। কিসের ভিত্তির তিনি তার অধিকার দাবি করবেন? তার বিয়ের সত্যতাই তো এখন হুমকির মুখে!

রিমা খাতুনের দুচোখে শুধুই অশ্রু আর শূণ্যতায় ভরা। মৌলভী সাহেবের দেওয়া সেই ‘কবুল’ বলা, উপস্থিত স্বাক্ষী দুজন, এতো মানুষের উপস্থিতি তো মিথ্যা ছিল না? সবকিছু ধর্মীয় রীতিতে যথাযথভাবে সম্পন্ন হলেও, সমস্যা হলো, কাজীর কাছে বা কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি না করার কারণে রিমা খাতুন আজ তার অধিকারগুলো প্রতিষ্টা করতে পারছেন না বা প্রতিষ্টা করতে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

এই একটি ‘ছোট্ট ভুল’ বহু নারীকে তাদের প্রাপ্য অধিকার, দেনমোহর, খোরপোষ এবং সন্তানের আইনগত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করছে। বিয়ে রেজিস্ট্রি না করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে? চলুন, এই বিষয়ে আমাদের দেশের আইন কী বলছে, তা স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা: বিয়ে রেজিস্ট্রির গুরুত্ব ও পরিণতি
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন অনুযায়ী, বিবাহ রেজিস্ট্রি করা শুধু একটি প্রথা নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক আইনি পদক্ষেপ।

রেজিস্ট্রেশন আইন: মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪-এর, মুসলিম বিবাহ অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে। রেজিস্ট্রি না করা আইনত একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

শাস্তি: কেউ যদি বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে ব্যর্থ হন, তবে তার দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

ভবিষ্যতের সমস্যাসমূহ-

রেজিস্ট্রি না করার ফলে ভবিষ্যতে মারাত্মক আইনি জটিলতা তৈরি হয়:
দেনমোহর ও ভরণপোষণ: স্ত্রী তার দেনমোহর ও ভরণপোষণ, খোরপোষ ইত্যাদি দাবি করার সময় বিয়ের প্রমাণ দেখাতে পারেন না। ফলে স্বামীকে সহজে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

তালাকের প্রমাণ: স্বামী বা স্ত্রী যখন তালাক দিতে চান, তখন তালাকের নোটিশ জারি বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা কঠিন হয়।

সন্তানের অধিকার: সন্তানের পিতৃত্ব বা সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

পাসপোর্ট ও ভিসা: বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে বা অন্যান্য সরকারি কাজে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রমাণের জন্য কাবিননামা অপরিহার্য।

মূল বার্তা: মৌলভী সাহেবের কাছে ধর্মীয় রীতিতে বিবাহ বৈধ হলেও, আইনি সুরক্ষা এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top