নারীর নিজের ঘরে থাকার আইনি অধিকার

আইন সহায়িকা ব্যানার। “নারীর নিজের ঘরে থাকার আইনি অধিকার” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

“আমার বাবার বাড়ি যাওয়ারও মুখ নেই, আর শ্বশুরবাড়ি থেকেও মাঝরাতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো। এখন আমি এই দুই সন্তান নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?” কয়েকদিন আগে এক অসহায় মা তার দুটি ছোট সন্তানকে নিয়ে আইনি পরামর্শের জন্য আমার চেম্বারে আসেন।

স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে যখন তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন, তখন তাকে গভীর রাতে শুধু এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমাদের সমাজের এটি একটি অত্যন্ত নির্মম এবং পরিচিত চিত্র। নির্যাতনের শিকার একজন নারীকে সবার আগে যে হুমকির মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো, “এই বাড়ি থেকে দূর হয়ে যাও!”

বাস্তবতা হলো, বাবার বাড়ির দরজাও সব সময় সবার জন্য খোলা থাকে না। ফলে মাথার ওপর একটা ছাদ হারানোর ভয়ে হাজারো নারী দিনের পর দিন মুখ বুজে সব অত্যাচার সহ্য করে যান। তারা ভাবেন, আইনি ব্যবস্থা নিলে তো বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দেবে, তখন থাকবেন কোথায়?

একজন আইনজীবী হিসেবে আপনাদের এমন একটি আইনি অধিকারের কথা জানাবো, যা জানলে যেকোনো অসহায় নারী বুক বেঁধে দাঁড়ানোর সাহস পাবেন।

নিজের ঘরে থাকার আইনি অধিকার: বাসস্থান আদেশ (Residence Order)

‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ এর ১৫ ধারা অনুযায়ী, যেকোনো ভুক্তভোগী নারী তার যৌথ বাসস্থান বা শ্বশুরবাড়িতে মর্যাদার সাথে বসবাসের আইনি অধিকার রাখেন। আইন অনুযায়ী, কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাকে সেই বাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে তাড়িয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়াও একটা অপরাধ।

এই ১৫ ধারার অধীনে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের কাছে আবেদন করলে আদালত ভুক্তভোগী নারীর সুরক্ষায় নিচের আদেশগুলো দিতে পারেন:

বাড়ি থেকে বের না করার নির্দেশ: আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিতে পারেন যে, মামলার বিচার চলাকালীন বা পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগী নারীকে তার যৌথ বাসস্থান বা শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনোভাবেই উচ্ছেদ বা বের করা যাবে না।

নির্যাতনকারীকে ঘর ছাড়ার নির্দেশ: পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, একই ছাদের নিচে থাকলে ওই নারীর জীবনের ঝুঁকি আছে, তবে আদালত নির্যাতনকারী ব্যক্তিকেই (যেমন: স্বামী বা অন্য কোনো অভিযুক্ত সদস্য) ওই বাড়ি থেকে সাময়িকভাবে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।

বিকল্প বাসস্থানের খরচ: কোনো কারণে যদি ওই বাড়িতে থাকা সম্ভব না-ই হয়, তবে ভুক্তভোগী নারী যেভাবে থাকতে অভ্যস্ত, ঠিক সেই মানের একটি বিকল্প নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং তার যাবতীয় ভাড়া বা খরচ দেওয়ার জন্য আদালত নির্যাতনকারীকে আদেশ দিতে পারেন।

একটি জরুরি বিষয় মনে রাখবেন:
এই আইনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, উক্ত বাসস্থান বা বাড়িটি কার নামে (স্বামীর নামে, শ্বশুরের নামে নাকি ভাড়াবাড়ি) তা অলঙ্ঘনীয় কোনো বিষয় নয়। নারী যদি সেখানে যৌথ পরিবারের সদস্য হিসেবে বসবাস করে আসেন, তবেই তিনি এই সুরক্ষার অধিকার পাবেন। স্বামী বা তার পরিবারের কেউ স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দিতে পারবেন না।

আইন আপনাকে অধিকার দিয়েছে, কিন্তু অজ্ঞতার কারণে অনেকেই এই অধিকারের কথা জানেন না। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর ভয়ে অত্যাচার সহ্য করার দিন এখন আর নেই।

Share the Post:
Scroll to Top