ডিভোর্সের সময় ২০ লাখ টাকা দেনমোহর দাবি করেছেন? তাহলে বিয়ের সময় যে ৫ লাখ টাকার আসবাবপত্র দিলেন, সেটা কি যৌতুক ছিল?
পারিবারিক আদালতের বারান্দায় প্রায়শই এমন অদ্ভুত ও জটিল তর্কের মুখোমুখি হতে হয়। যখনই কোনো দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ বা কলহ তৈরি হয়, তখনই বরপক্ষ কনেপক্ষের বিরুদ্ধে ‘যৌতুকের মিথ্যা মামলা’র অভিযোগ তোলে, আর কনেপক্ষ বরপক্ষের বিরুদ্ধে ‘দেনমোহর ফাঁকি দেওয়া’ বা ‘যৌতুকের জন্য নির্যাতনের’ অভিযোগ আনে।
আমাদের সমাজের একটা বিরাট অংশ মনে করে, দেনমোহর আর যৌতুক বুঝি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, অর্থাৎ, “ছেলে পক্ষ দেনমোহর দেবে, আর মেয়ে পক্ষ যৌতুক (উপহারের নামে) দেবে।”
একজন আইনজীবী হিসেবে আজ আপনাদের এই মারাত্মক ভুল ধারণাটি ভেঙে দিতে চাই এবং কাবিননামায় এই দুটির আসল আইনি অবস্থান পরিষ্কার করছি।
দেনমোহর বনাম যৌতুক: আইনি পার্থক্য ও খুটিনাটি
আইনের চোখে দেনমোহর হলো কনের একটি পবিত্র আইনি ও ধর্মীয় অধিকার, আর অন্যদিকে যৌতুক হলো একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এদের মূল পার্থক্যগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. আইনি স্বীকৃতি ও বাধ্যবাধকতা (দেনমোহর): মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর (Dower) হলো বিয়ের অন্যতম প্রধান শর্ত। কাবিননামার বা নিকাহনামার ১৪ নম্বর ঘরে এটি নির্দিষ্ট করে লেখা থাকে। এটি বর কর্তৃক কনেকে সম্মান ও নিরাপত্তা স্বরূপ দেওয়ার জন্য একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। বর এটি দিতে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারবে না।
২. অপরাধের খাত (যৌতুক): অন্যদিকে, ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী, বিয়ের শর্ত হিসেবে বরপক্ষ কনেপক্ষের কাছে যে অর্থ বা সম্পত্তি দাবি করে, তা স্পষ্ট অপরাধ। আইন অনুযায়ী, কাবিননামায় যৌতুকের কোনো স্থান নেই এবং এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড।
৩. অধিকার বনাম পণ: দেনমোহর হলো নারীর সম্পূর্ণ নিজস্ব সম্পত্তি, যা তাকে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেয়। কিন্তু যৌতুক হলো বিয়ের বাজারে কনেপক্ষকে বাধ্য করে আদায় করা একটি অবৈধ পণ।
দেনমোহর কি যৌতুকের বিপরীতে ‘অ্যাডজাস্ট’ বা কাটাকাটি করা যায়?
অনেকের জন্য পারিবারিক জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টের ব্যাপার হলো, অনেকে ভাবেন বিয়ের সময় মেয়েকে যে ফ্রিজ, টিভি, খাট বা গাড়ি দেওয়া হলো, সেগুলোর দাম ডিভোর্সের সময় দেনমোহরের টাকা থেকে মাইনাস বা কাটাকাটি করা যাবে।
আইনগত সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বিয়ের সময় কনেপক্ষ স্বেচ্ছায় মেয়েকে যা দেয়, তা বড়জোর ‘উপহার’ বা ‘যৌতুক বাদে অন্যান্য সামগ্রী’ (কাবিননামার ১৬ ও ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য) হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু বরের দেনমোহরের ঋণ কনেপক্ষের দেওয়া কোনো উপহার দিয়ে শোধ বা কাটাকাটি করা আইনত অসম্ভব। দেনমোহরের টাকা বরকে আলাদাভাবেই পরিশোধ করতে হবে।
একজন আইনজীবীর পরামর্শ:
বিয়ের সময় কাবিননামা বা নিকাহনামা লেখার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। দেনমোহরের কত টাকা ‘নগদ পরিশোধ’ (উসুল) হলো এবং কত টাকা ‘বাকি’ (মুয়াজ্জাল), তা স্পষ্টভাবে ১৪ নম্বর ঘরে লিখুন। বিয়ের সময় কনেকে কোনো স্বর্ণালঙ্কার বা উপহার দিলে তা ১৬ ও ১৭ নম্বর ঘরে সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করুন, যেন পরবর্তীতে তা নিয়ে ‘যৌতুক’ বা ‘দেনমোহর ফাঁকি’র মতো কোনো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি না হয়।