তুমি তো নিজেই ইনকাম করো, আমার কাছে টাকা চাচ্ছ কেন?
রেশমা বেগম একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে বেশ ভালো বেতনে চাকরি করেন। তার স্বামীও একজন করপোরেট কর্মকর্তা। বিয়ের পর থেকেই রেশমার স্বামী সংসারের কোনো খরচ তো দেনই না, উল্টো রেশমার বেতনের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে তা নিয়ে প্রতিদিন জবাবদিহি চান।
রেশমা যখন নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বা বাচ্চার একটা বিশেষ খরচের জন্য স্বামীর কাছে টাকা চান, স্বামী তখন রেগে গিয়ে বলেন- “তুমি নিজে এত টাকা বেতন পাও, তাও আমার পকেট কাটার ধান্দা? আইনও বলে না যে চাকরিজীবী বউকে টাকা দিতে হবে।”
রেশমা বেগম দোটানায় পড়ে গেলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে তিনি কি আসলেই স্বামীর কাছে ভরণপোষণ দাবি করার আইনি অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন?
আইন কী বলে?
একজন আইনজীবী হিসেবে আমি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলছি- রেশমার স্বামীর এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং আইনবহির্ভূত। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়মগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ভরণপোষণ একটি মৌলিক আইনি বাধ্যবাধকতা: মুসলিম পারিবারিক আইন ও সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, স্ত্রীকে ভরণপোষণ (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা) দেওয়া স্বামীর একটি শর্তহীন এবং নিরঙ্কুশ দায়িত্ব। স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ বা চাকরি আছে কি না, তার ওপর স্বামীর এই আইনি দায়িত্ব বিন্দুমাত্র নির্ভর করে না।
২. স্ত্রীর আয় সম্পূর্ণ তার নিজস্ব সম্পত্তি: একজন কর্মজীবী স্ত্রী চাকরি করে যে টাকা আয় করেন, তার ওপর স্বামীর কোনো আইনি বা ধর্মীয় অধিকার নেই। স্ত্রী চাইলে তার আয়ের টাকা সম্পূর্ণ নিজের জিম্মায় রাখতে পারেন, জমিয়ে রাখতে পারেন কিংবা তার বাবা-মাকে দিতে পারেন। সংসারে সেই টাকা খরচ করতে স্বামী তাকে আইনত বাধ্য করতে পারেন না।
৩. চাকরি করা কোনো অবাধ্যতা নয়: অনেক স্বামী আদালতে যুক্তি দেখান যে, স্ত্রী তার নিষেধ সত্ত্বেও চাকরি করছেন, তাই তিনি ভরণপোষণ দেবেন না। তবে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ রয়েছে যে, স্ত্রী যদি কোনো সম্মানজনক ও বৈধ পেশায় যুক্ত থাকেন, তবে তাকে ‘অবাধ্য’ বা ‘নাফরমান’ বলে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
৪. আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি: স্ত্রী কোটিপতি হলেও স্বামী তার নিজের সামর্থ্য ও সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী স্ত্রীর নূন্যতম ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। পারিবারিক আদালতে যদি কোনো কর্মজীবী নারী ভরণপোষণের মামলা করেন, তবে আদালত স্বামীর আয় ও সামর্থ্য বিবেচনা করে একটি যৌক্তিক অংক নির্ধারণ করে দেন। স্ত্রী চাকরি করেন বলে স্বামীর দায়িত্ব এখানে ‘শূন্য’ হয়ে যায় না।
প্রিয় পাঠক, স্বাবলম্বী হওয়া মানেই নিজের আইনি অধিকার বিসর্জন দেওয়া নয়। সংসারে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একে অপরকে আর্থিক সহযোগিতা করা একটি সুন্দর মানসিকতা, কিন্তু আইনগতভাবে স্ত্রীর ভরণপোষণের মূল দায়িত্বটি সব সময় স্বামীর কাঁধেই ন্যস্ত থাকে।