স্বামীর সামর্থ্য বনাম দেনমোহরের পরিমাণ

আইন সহায়িকা ব্যানার। “স্বামীর সামর্থ্য বনাম দেনমোহরের পরিমাণ” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

বিয়ের সময় ‘স্ট্যাটাস’ দেখাতে ৫০ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধরলেন, কিন্তু স্বামীর মাসিক আয় মাত্র ৩০ হাজার টাকা! এই লোক-দেখানো দেনমোহর কি আসলেই কোনো পক্ষের কল্যাণ বয়ে আনে?

সাজ্জাদ ও রিয়ার বিয়ের সময় রিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হলো দেনমোহর হতে হবে ৫০ লক্ষ টাকা। সাজ্জাদের সরকারি চাকুরির বেতন বা পারিবারিক সামর্থ্য কোনোটিই এর ধারেকাছে ছিল না। কিন্তু সমাজ ও আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে বলা হলো- “বিয়ের সময় একটু বেশি না ধরলে কেমন দেখায়? আর দেনমোহরের টাকা কি আসলেই কেউ দেয় নাকি!” সাজ্জাদও বাধ্য হয়ে রাজি হলেন।

আজ ৩ বছর পর তাদের সংসার ভাঙার উপক্রম। সাজ্জাদের সামনে এখন ৫০ লক্ষ টাকার দেনমোহরের মামলা। এই বিপুল অংক পরিশোধের সামর্থ্য তার নেই, যার ফলে বিষয়টি এখন জেলের ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে রিয়াও হয়তো কাগজের পাতায় ৫০ লক্ষ টাকা দেখছেন, কিন্তু স্বামীর সামর্থ্য না থাকায় বাস্তবে সেই টাকা আদায় করা তার জন্য পাহাড়সম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বামীর সামর্থ্য বনাম দেনমোহরের পরিমাণ: আইন ও যৌক্তিকতার পরিমাপগুলো জেনে নেয়া যাক আজ।

আইনগত ব্যাখ্যা ও সমাধান:

১. আইন ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামি আইন এবং মুসলিম পারিবারিক আইনের মূল কথা হলো- দেনমোহর হবে এমন একটি অংক, যা নারীর সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে এবং একই সাথে যা পরিশোধ করার আর্থিক সামর্থ্য স্বামীর রয়েছে। এটি কোনো ‘সামাজিক জরিমানা’ বা ‘লৌকিকতার সস্তা হাতিয়ার’ নয়, বরং এটি বিয়ের একটি আবশ্যকীয় শর্ত ও স্ত্রীর একটি সুনির্দিষ্ট আইনি অধিকার।

২. অবাস্তব দেনমোহরের আইনি জটিলতা:
বিয়ের সময় সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কোটি বা লক্ষ টাকা দেনমোহর লিখে ফেললে আইনত স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য। আইন বা আদালত সাধারণত কাবিননামায় লিখিত অংকটিকেই চূড়ান্ত ধরে। ফলে সম্পর্ক ভেঙে গেলে স্বামী যদি তা পরিশোধ করতে না পারেন, তবে ডিক্রি জারির মাধ্যমে তার সম্পত্তি ক্রোক হতে পারে, এমনকি দেউলিয়া বা কারাদণ্ডের মতো আইনি পরিণতিও হতে পারে।

৩. দেনমোহর কত হওয়া যৌক্তিক?
আইনগতভাবে দেনমোহরের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা নেই। তবে আদর্শ নিয়ম হলো ‘মোহর-ই-মিসল’ বা উপযুক্ত দেনমোহরের ধারণাটি মাথায় রাখা। অর্থাৎ:

স্ত্রীর বাবার বংশের অন্যান্য সমমর্যাদার নারীদের (যেমন: ফুফু বা বোন) দেনমোহর কেমন ছিল।

স্ত্রীর নিজস্ব শিক্ষা, যোগ্যতা এবং গুণাবলি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- বিয়ের সময় বা নিকট ভবিষ্যতে স্বামীর প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা ও আয়।

৪. উভয় পক্ষের সচেতনতা জরুরি:
কনের পরিবারের মনে রাখা উচিত, অবাস্তব দেনমোহর কখনোই সংসারের স্থায়িত্বের গ্যারান্টি দেয় না। আবার বরের পরিবারেরও উচিত লৌকিকতার খাতিরে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কাবিননামায় সই না করা। দেনমোহর এমন হওয়া উচিত যা বর বিয়ের পরপরই বা দাম্পত্য জীবনে সহজেই পরিশোধ করে দিতে পারেন।

আইনগত বার্তা: বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। এটিকে লোক-দেখানো অংকের মারপ্যাঁচে ফেলে শুরুতেই আইনি ও মানসিক ঝুঁকিতে ফেলবেন না। যৌক্তিক দেনমোহর নির্ধারণ বরকে ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত রাখে আর কনেকে দেয় একটি বাস্তবসম্মত আইনি ও আর্থিক নিরাপত্তা।

Share the Post:
Scroll to Top