স্ত্রী আগে ডিভোর্স দিলে কি দেনমোহর মাফ হয়ে যায়?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “স্ত্রী আগে ডিভোর্স দিলে কি দেনমোহর মাফ হয়ে যায়?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

“তুমি নিজে থেকে ডিভোর্স দিচ্ছো, আবার কিসের দেনমোহর? আইনে আছে, এখন আর তুমি এক টাকাও পাবে না!”- এই একটি লাইনে সমাজে প্রতিদিন হাজার হাজার নারীর আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

আমার চেম্বারে কিছুদিন আগে ফারজানা আক্তার নামের এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন। স্বামীর ক্রমাগত অবহেলা আর মানসিক নির্যাতন যখন সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়, তখন তিনি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যখনই তিনি নিজের আইনি অধিকার বা দেনমোহরের কথা তুললেন, তখন তার স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজন সাফ জানিয়ে দিলেন— “আইন জানো না? ডিভোর্স যেহেতু তুমি নিজে দিচ্ছো, তাই দেনমোহর পাওয়ার সব অধিকার তুমি হারিয়েছো।”

ফারজানা দ্বিধায় আর ভয়ে পড়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, সম্মান বাঁচাতে গিয়ে কি তাকে নিজের ন্যায্য অধিকারও বিসর্জন দিতে হবে?

ফারজানার মতো আমাদের বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের মনে এই ধারণাটি পাথরের মতো গেঁথে আছে যে, স্ত্রী নিজে ডিভোর্স দিলে স্বামী দেনমোহর দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত হয়ে যান। চলুন আজ একজন আইনজীবী হিসেবে এই বিষয়ে আইনের আসল সত্যটি আপনাদের সামনে তুলে ধরি।

আইনগত সত্য: দেনমোহর স্ত্রীর ‘অর্জিত অধিকার’
বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর (Dower) কোনো দয়া, দান বা উপহার অথবা উপহারের মতো নয়; এটি হচ্ছে বিয়ের সময় হওয়া চুক্তির অংশ এবং স্বামীর ওপর স্ত্রীর একটি আইনি প্রাপ্য ঋণ।

১. ডিভোর্স কে দিলো, তা অলীক: আইন স্পষ্ট বলে, বিবাহ বিচ্ছেদের উদ্যোগ স্বামী নিক কিংবা স্ত্রী, দেনমোহর পরিশোধের দায় থেকে স্বামীর কোনো মুক্তি নেই। স্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে তালাক (তালাক-ই-তাফওয়ীজ বা কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতা বলে) দিলেও তিনি শতভাগ দেনমোহর দাবি করার আইনি অধিকার রাখেন।

২. আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ: স্ত্রী যদি ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের অধীনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে (যেমন: নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেওয়া ইত্যাদি) পারিবারিক আদালতে মামলা করে বিচ্ছেদ পান, তবুও স্বামী দেনমোহরের পুরো টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য।

৩. একমাত্র ব্যতিক্রম (খুলা তালাক): কেবল ‘খুলা’ বা পারস্পরিক সমঝোতা তালাকের ক্ষেত্রে (যেখানে স্ত্রী স্বামীর সাথে সংসার করতে চান না এবং বিচ্ছেদের শর্ত হিসেবে নিজের দেনমোহরের আংশিক বা পুরো অংশ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে রাজি হন) দেনমোহর মওকুফ হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, এটি হতে হবে স্ত্রীর সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্তে, কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি বা চাপে ফেলে নয়।

পুরুষদের জন্য আইনি বার্তা: অনেক পুরুষ ভাবেন স্ত্রীকে এমনভাবে মানসিক চাপ দেবেন যেন স্ত্রী নিজেই ডিভোর্স দিতে বাধ্য হন এবং দেনমোহর বেঁচে যায়। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আইনত আপনি আপনার স্ত্রীর দেনমোহরের দায় থেকে কখনোই মুক্ত নন, যতক্ষণ না তা আপনি পুরোপুরি পরিশোধ করছেন।

আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনা, প্রেক্ষাপট এবং কাবিননামার শর্তাবলি সাধারণত ভিন্ন হয়। তাই যেকোনো বিচ্ছেদের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বা দেনমোহর আদায়ে আইনি জটিলতা তৈরি হলে কোনো সামাজিক গুজবে কান না দিয়ে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

Share the Post:
Scroll to Top