দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলা কি তালাকের পথ বন্ধ করে দেয়?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলা কি তালাকের পথ বন্ধ করে দেয়?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

আদালতে সংসার টেকার মামলা চলছে মানেই কি বিচ্ছেদের সব পথ চিরতরে বন্ধ? আইন কি দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলার বেড়াজালে কাউকে সারাজীবন আটকে রাখতে পারে?

কয়েকদিন আগে এক ভদ্রলোক খুব চিন্তিত মুখে আমার চেম্বারে এলেন। তার স্ত্রী কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রায় এক বছর ধরে আলাদা থাকছেন। ভদ্রলোক তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য পারিবারিক আদালতে ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’-এর মামলা করেছেন।

কিন্তু মামলার মাঝপথে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে, তিনি বুঝতে পারলেন এই সংসার আর কোনোভাবেই টিকবে না। তিনি আমাকে অসহায়ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “অ্যাডভোকেট সাহেব, আমি তো কোর্টে সংসার করার জন্য মামলা দিয়ে রেখেছি। এখন কি আমি চাইলে তাকে তালাক দিতে পারবো? নাকি মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বা এই মামলা চলার কারণে আমার তালাক দেওয়ার অধিকার বন্ধ হয়ে গেছে?”

আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভয়টি প্রকট। অনেকেই মনে করেন, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মামলা করলে কিংবা আদালত স্বামীকে ফিরিয়ে নেওয়ার ডিক্রি (রায়) দিয়ে দিলে, সেই বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার আর কোনো আইনি পথ থাকে না। এই অমূলক ভয়ের কারণে অনেকে সঠিক সময়ে সঠিক আইনি সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করেন।

আইনগত ব্যাখ্যা ও প্রকৃত সত্য:
বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন ও পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের আলোকেও এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। সত্যটা হলো- দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলা কোনোভাবেই তালাকের আইনগত পথ বন্ধ করে না।

স্বাধীন অধিকার: তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ এবং দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা আইনি প্রক্রিয়া। মুসলিম আইনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিস্কের স্বামী বা স্ত্রীর তালাক দেওয়ার যে অধিকার রয়েছে, তা কোনো চলমান মামলার কারণে স্থগিত হয়ে যায় না।

মামলা চলাকালীন তালাক: দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেও স্বামী (কিংবা তালাক-ই-তৌফিজ বা তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত স্ত্রী) মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী যথাযথ নিয়ম মেনে তালাকের নোটিশ পাঠাতে পারেন।

মামলার পরিণতি: যদি মামলা চলাকালীন নোটিশের মাধ্যমে তালাক আইনগতভাবে কার্যকর হয়ে যায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মামলাটি ‘অকার্যকর’ (Infructuous) হয়ে পড়ে এবং আদালত তা খারিজ বা নিষ্পত্তি করে দেন। কারণ, যখন বৈবাহিক সম্পর্কটিই আর অস্তিত্বশীল থাকে না, তখন দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের আর কোনো ভিত্তি থাকে না।

আইন কী বলে বনাম বাস্তবে কী হয়:

আইন কী বলে: আইন স্পষ্ট করে বলে, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের ডিক্রি কেবল একটি ঘোষণা যে, পক্ষদ্বয়ের একসাথে থাকা উচিত। কিন্তু এটি কোনো পক্ষকে তালাক দেওয়ার মৌলিক আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না। এমনকি আদালত ডিক্রি দেওয়ার পরও যদি স্বামী বা স্ত্রী মনে করেন তারা একসাথে থাকতে পারবেন না, তবে তারা বিচ্ছেদের পথ বেছে নিতে পারেন।

বাস্তবে কী হয়: বাস্তবে অনেকে মনে করেন এই মামলাটি ঝুলিয়ে রেখে অপর পক্ষকে আজীবন ‘ঝুলিয়ে’ রাখা যাবে বা কষ্ট দেওয়া যাবে। কিন্তু আইন কাউকে এভাবে আটকে রাখার অনুমতি দেয় না। ডিক্রি হওয়ার পরেও যদি কোনো পক্ষ স্বাধীনভাবে তালাক কার্যকর করে, তবে আগের ডিক্রিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার কার্যকারিতা হারায়।

Share the Post:
Scroll to Top