পরকীয়ার ডিজিটাল এভিডেন্স সংরক্ষণের সঠিক উপায়

আইন সহায়িকা ব্যানার। “পরকীয়ার ডিজিটাল এভিডেন্স সংরক্ষণের সঠিক উপায়” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

পরকীয়ার প্রমাণ পেয়েছেন? ভুলভাবে সংরক্ষণ করলে আদালতে সেটি মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে!

“স্যার, সব প্রমাণ ছিল। কিন্তু এখন মোবাইল নষ্ট হয়ে গেছে”, অথবা “রাগের মাথায় স্ক্রিনশটগুলো ডিলিট করে ফেলেছিলাম।” পারিবারিক আদালতে মামলা লড়ার সময় মক্কেলদের মুখে এই আফসোস আমি প্রায়ই শুনি।

অনেকেই পরকীয়ার অকাট্য সব প্রমাণ, যেমন চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট, অডিও রেকর্ড বা ছবি হাতের মুঠোয় পান। কিন্তু সেগুলো সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ না করার কারণে, মামলার চূড়ান্ত সময়ে এসে দেখা যায় ফোনটি নষ্ট হয়ে গেছে, চ্যাট ডিলিট হয়ে গেছে কিংবা অপর পক্ষ প্রমাণটিকে ‘ভুয়া’ বলে সহজেই পার পেয়ে গেছে।

ডিজিটাল প্রমাণের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, একে খুব সহজে এডিট বা পরিবর্তন করা যায়। তাই আপনি যত বড় প্রমাণই পান না কেন, আদালতে সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হলে ‘চেইন অব কাস্টডি’ (Chain of Custody) বা প্রমাণের ধারাবাহিক সুরক্ষার নিয়ম মানতে হবে।

সহজ ভাষায়, প্রমাণটি পাওয়ার পর থেকে আদালতে জমা দেওয়া পর্যন্ত সেটি যে কোনোভাবে পরিবর্তন বা টেম্পারিং করা হয়নি, তা প্রমাণ করার আইনি গাইডলাইন নিচে দেওয়া হলো:

১. স্ক্রিনশট নেওয়ার সঠিক নিয়ম ও ব্যাকআপ
শুধু একটা স্ক্রিনশট তুলে রেখে দিলে চলবে না।

পদ্ধতি: ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশট নেওয়ার সময় ওপরের প্রোফাইল নাম, ছবি এবং অবশ্যই তারিখ ও সময় (Timestamp) যেন স্পষ্ট দেখা যায়। সম্ভব হলে পুরো চ্যাট হিস্ট্রির একটি স্ক্রিন রেকর্ড (ভিডিও) করে রাখুন।

ব্যাকআপ: প্রমাণ পাওয়ার সাথে সাথেই সেটি গুগল ড্রাইভ, ড্রপবক্স বা আপনার ব্যক্তিগত ইমেইলে ব্যাকআপ করে রাখুন, যেন মূল ডিভাইসটি হারিয়ে বা নষ্ট হলেও প্রমাণ সুরক্ষিত থাকে।

২. সিডি (CD/DVD) ও পেনড্রাইভে রাইট করা
মোবাইল বা ল্যাপটপে থাকা ডিজিটাল ফাইল সরাসরি আদালতে জমা দেওয়া যায় না।

পদ্ধতি: অডিও ফাইল, ভিডিও, ছবি বা চ্যাটের পিডিএফ কপি একটি রাইট-অনস (Write-once) সিডি/ডিভিডি অথবা একটি সম্পূর্ণ নতুন পেনড্রাইভে কপি করুন। সিডি বা পেনড্রাইভে ফাইল নেওয়ার পর সেটি সিলগালা খামে ভরে রাখুন এবং তার ওপর তারিখ ও আপনার স্বাক্ষর দিয়ে রাখুন, যাতে প্রমাণ হয় এটি সুরক্ষিত ছিল।

৩. জিডি (GD) বা নোটারির মাধ্যমে ‘টাইমস্ট্যাম্প’ নিশ্চিত করা
ডিজিটাল এভিডেন্সের ক্ষেত্রে আদালত দেখতে চায় আপনি প্রমাণটি ঠিক কবে পেয়েছেন এবং এটি পরে বানিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না।

পদ্ধতি: প্রমাণ পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করে রাখতে পারেন। জিডিতে উল্লেখ করুন যে, আপনি অমুক তারিখে, অমুক মাধ্যমে এই ডিজিটাল তথ্যগুলো পেয়েছেন। এছাড়া একজন নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে স্ক্রিনশট বা চ্যাটের প্রিন্ট কপিগুলো নোটারাইজড করে রাখতে পারেন। এটি আদালতে প্রমাণ করবে যে একটি নির্দিষ্ট তারিখে এই তথ্যগুলো হুবহু এই অবস্থায় বিদ্যমান ছিল।

৪. মূল ডিভাইসটি (Source Device) সাবধানে রাখা
বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (Evidence Act) অনুযায়ী, ডিজিটাল প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের সময় মূল ডিভাইসটি (যে ফোন বা ল্যাপটপ দিয়ে চ্যাট বা রেকর্ড করা হয়েছে) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সতর্কতা: মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মূল ফোনটি কোনোভাবেই রিসেট দেবেন না, ওলটপালট করবেন না বা মেকানিক দিয়ে অননুমোদিতভাবে মেরামত করাবেন না। আদালত চাইলে যেকোনো সময় মূল ডিভাইসটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য তলব করতে পারেন।

মোট কথা, আদালতে শুধু ‘সত্য’ থাকাটাই যথেষ্ট নয়, সেই সত্যকে ‘আইনসম্মতভাবে’ প্রমাণ করতে হয়। আপনার অসচেতনতার কারণে যেন একটি শক্তিশালী প্রমাণও কাগজের টুকরোয় পরিণত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

তবে আরও একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রমাণ সংগ্রহের নামে কারও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা, পাসওয়ার্ড চুরি করা বা বেআইনিভাবে ডিভাইসে প্রবেশ করা নিজেই আইনি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

Share the Post:
Scroll to Top