ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং বাসস্থানের অধিকার

আইন সহায়িকা ব্যানার। “ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং বাসস্থানের অধিকার” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

তালাকের পরপরই কি একজন নারীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া যায়? ইদ্দতকালীন অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক আজ।

শুরুতে এ সম্পর্কে একটু ভয়াবহ ঘটনা শুনুন। তালাকনামা হাতে পাওয়ার পর ফারিয়া আক্তারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার চেয়েও বড় ধাক্কাটা এলো যখন শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে বলল, ‘আমাদের ছেলের সাথে যখন সম্পর্কই শেষ, তখন এই বাড়িতে তোমার আর এক মুহূর্ত থাকার অধিকার নেই। এখনই নিজের ব্যাগ গুছিয়ে বিদায় হও।’ মাঝরাতে কাপড়েচোপড়ে ফারিয়া আক্তারকে বাপের বাড়ির পথ ধরতে হলো।

আমাদের সমাজে এটি অত্যন্ত চেনা এবং নির্মম একটি চিত্র। তালাকের নোটিশ আসার পরপরই বা মুখে তালাক উচ্চারণের পরেই নারীকে সাথে সাথে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। আশ্রয়হীন সেই নারী তখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং কোথায় যাবেন, কী করবেন তা ভেবে পান না।

কিন্তু দেশের আইন কি সত্যিই এত নিষ্ঠুর? তালাক হলেই কি একজন নারীর সাথে সাথে ঘর ছাড়তে হবে?

আইনি সত্য: ‘ইদ্দতকালীন’ সময়ে বাসস্থান ও ভরণপোষণ নারীর আইনি অধিকার
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার পরপরই বৈবাহিক সম্পর্ক একবারে ছিন্ন হয়ে যায় না। চূড়ান্তভাবে বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার আগে নারীকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যাকে আইনি ও ধর্মীয় ভাষায় ‘ইদ্দতকাল’ বলা হয়।

সাধারণত তালাকের নোটিশ পাওয়ার পর থেকে ৩ মাস (বা তিনটি মাসিক চক্রের সময়কাল) হলো ইদ্দতকাল। আর নারী যদি তালাক পাওয়ার সময় সন্তানসম্ভবা (গর্ভবতী) থাকেন, তবে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত তার ইদ্দতকাল বজায় থাকবে।

এই ইদ্দতকালীন সময়ে একজন নারীর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে:

১. স্বামীর ঘরে থাকার অধিকার (বাসস্থান)
ইদ্দত চলাকালীন সময়ে স্ত্রীকে জোরপূর্বক ঘর থেকে বের করে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। এই সময়টুকুতে তিনি স্বামীর ঘরে বা থাকার জায়গায় সম্মানজনকভাবে অবস্থান করার পূর্ণ আইনি অধিকার রাখেন। হুট করে তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ আইনের কোথাও নেই।

২. সম্পূর্ণ ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার
ইদ্দতকালীন পুরো সময়টাতে স্ত্রীর খাওয়া-পরা, চিকিৎসা ও যাবতীয় জীবনযাত্রার খরচ (ভরণপোষণ) স্বামীকে বহন করতে হবে। স্ত্রী যদি গর্ভবতী হন, তবে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত এবং প্রসবকালীন যাবতীয় খরচ জোগানো স্বামীর আইনি বাধ্যবাধকতা।

বিস্তারিত আইনি ব্যাখ্যা:
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961): এই আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, তালাকের নোটিশ চেয়ারম্যান বা সালিসি পরিষদের কাছে পৌঁছানোর পর ৯০ দিন (বা ৩ মাস) অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয় না। আইনগতভাবে এই ৯০ দিন স্ত্রী তার সমস্ত অধিকারসহ স্ত্রীর মর্যদাতেই বহাল থাকেন।

১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ (Family Courts Ordinance, 1985): কোনো স্বামী যদি এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্ত্রীকে বাসস্থান না দেন বা ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন, তবে ভুক্তভোগী নারী পাওনা আদায়ের জন্য সরাসরি পারিবারিক আদালতে (Family Court) মামলা করতে পারেন। আদালত আইন অনুযায়ী স্বামীকে এই খরচ ও ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করবেন।

আমার পরামর্শ:
আবেগ বা সামাজিক চাপের মুখে পড়ে নিজের আইনি অধিকার ছেড়ে দেবেন না। আইন কোনো নারীকে তালাকের পরপরই এভাবে রাস্তায় ছুড়ে ফেলার অনুমতি দেয় না। যেকোনো পরিস্থিতিতে আইন জানুন এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকুন।

Share the Post:
Scroll to Top