“বাবা মুখে বলে গেছেন, তাই এই জমির মালিক আমি!” – এই একটি ভুল ধারণা আজ হাজারো পরিবারকে আদালতের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আমাদের সমাজে এখনো অনেক বাবা-মা বা প্রবীণ মানুষ আছেন, যারা সন্তানদের ডেকে বলেন- “আমার এই বাড়িটা বা এই জমিটা আজ থেকে তোকে দিয়ে দিলাম।” সন্তানও পরম নিশ্চিন্তে ধরে নেয় সম্পত্তি তার হয়ে গেছে। কিন্তু যখন সেই বাবা-মা মারা যান, তখন অন্য ভাই-বোন বা শরিকরা এসে আইনি ভাগ দাবি করে। তখনই শুরু হয় আসল বিপর্যয়। মুখের কথার কি আসলেই কোনো আইনি মূল্য আছে?
একজন আইনজীবী হিসেবে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলছি, বর্তমানে মুখে মুখে হেবা বা দানের কোনো আইনি বৈধতা নেই। দলিল রেজিস্ট্রি না করে শুধু মুখের কথায় সম্পত্তি দাবি করার শেষ পরিণতি কেবলই মামলা-মোকদ্দমা এবং পারিবারিক শত্রুতা।
আজকের পোস্টে এই বিষয়ে দেশের প্রচলিত আইন ও এর ভয়ানক পরিণতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি।
আইন কী বলে?
একটা সময় মুসলিম আইনে মুখে মুখে হেবা বা দান করার সুযোগ ছিল, যেখানে মৌখিক ঘোষণা, গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তর হলেই চলতো। কিন্তু এই সুযোগ নিয়ে জালিয়াতি এবং পারিবারিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করায় ২০০৪ সালে সরকার আইন সংশোধন করে।
এছাড়াও সংশোধিত রেজিস্ট্রেশন আইন (The Registration Act, 1908): এই আইন অনুযায়ী, যেকোনো হেবা বা দান অবশ্যই লিখিত এবং রেজিস্ট্রিভুক্ত (Registered) হতে হবে।
সময়সীমা: আইন অনুযায়ী, হেবা ঘোষণার পর সর্বোচ্চ ৩ (তিন) মাসের মধ্যে সেটি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করতে হবে। যদি এই সময়ের মধ্যে দলিল রেজিস্ট্রি করা না হয়, তবে আইনের চোখে সেই হেবা বা দানের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
তাই বাবা, দাদা বা স্বামী মুখে মুখে জমি লিখে দিয়েছেন, এই দাবির ওপর ভিত্তি করে বর্তমান যুগে জমির মালিকানা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মুখে মুখে হেবা করার ৩টি ভয়ানক পরিণতি
১. মালিকানা প্রমাণে ব্যর্থতা ও উচ্ছেদ: দলিল রেজিস্ট্রি না থাকলে সরকারি রেকর্ডে বা খতিয়ানে আপনার নাম উঠবে না। ফলে অন্য ওয়ারিশরা চাইলে যেকোনো সময় আপনাকে আইনগতভাবে সেই সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে এবং আপনি আদালতে গিয়েও হেরে যাবেন।
২. জমি বিক্রি বা ব্যাংক লোন না পাওয়া: আপনার নামে যদি রেজিস্ট্রি করা হেবা দলিল এবং নামজারি (Mutation) না থাকে, তবে আপনি ভবিষ্যতে সেই জমি কারো কাছে বিক্রি করতে পারবেন না। এমনকি জরুরি প্রয়োজনে সেই সম্পত্তি বন্ধক রেখে ব্যাংক লোনও নিতে পারবেন না।
৩. রক্তের সম্পর্কের চিরতরে অবসান: মুখের কথার কোনো লিখিত প্রমাণ না থাকায় ভাই-বোনের মধ্যে তীব্র অবিশ্বাস তৈরি হয়। বাবা মারা যাওয়ার পর শুরু হয় সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা। এতে টাকা ও সময় তো নষ্ট হয়ই, সাথে পরিবারের ভেতরের ভালোবাসার সম্পর্ক চিরতরে শেষ হয়ে যায়।
এই জটিলতা থেকে বাঁচার উপায় কী?
যদি আপনার পরিবারের কোনো সদস্য আপনাকে কোনো সম্পত্তি ভালোবেসে দিতে চান, তবে দেরি না করে এই দুটি কাজ অবিলম্বে করুন:
রেজিস্ট্রি দলিল করুন: মুখে মুখে বা শুধু ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখে রাখা বন্ধ করুন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে প্রপার ‘হেবা দলিল’ বা ‘দান দলিল’ রেজিস্ট্রি করে নিন। (উল্লেখ্য, নির্দিষ্ট রক্তের সম্পর্কের মধ্যে হেবা দলিলের সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি নাম মাত্র)।
দ্রুত নামজারি (Mutation) করান: দলিল হাতে পাওয়ার পরপরই এসি ল্যান্ড (AC Land) অফিসে আবেদন করে নিজের নামে খতিয়ান বা নামজারি করিয়ে নিন এবং খাজনা দিন।
আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ: মুখের কথায় বিশ্বাস করে নিজের ভবিষ্যৎ ও মাথার গোঁজার ঠাঁইকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না। জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, আইনের নিয়ম মেনে চলুন।