“জীবনভর কষ্ট করে যে সন্তানদের মানুষ করলাম, মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলাম, আজ তারাই আমাকে পর করে দিল! নিজের জমি-বাড়ি সব ছেলেদের নামে লিখে দেওয়ার পর এখন আমার থাকার জায়গা হয়েছে বারান্দার এক কোণে।”
একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এমন বুকফাটা আর্তনাদ আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়। মা-বাবা অনেক সময় অতি আবেগে বা সন্তানদের চাপে পড়ে জীবিত অবস্থাতেই সব সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেন। আবার অনেকে ভাবেন, “এখনই লিখে দেওয়ার কী দরকার? আমি মারা গেলে তো ওরাই পাবে।”
এই দুই সিদ্ধান্তের মাঝখানে আইনি ও বাস্তবসম্মত বিশাল কিছু পার্থক্য রয়েছে, যা না জানার কারণে শত শত পরিবার শেষ বয়সে এসে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
আজকের আলোচনার মূল বিষয়- জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি লিখে দেওয়া ভালো, নাকি মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে যাওয়া ভালো? আইন কী বলে?
১. জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি লিখে দেওয়া (হেবা বা দান)
আপনি জীবিত থাকা অবস্থায় আপনার কোনো সম্পত্তি কাউকে সম্পূর্ণ মালিকানা বুঝিয়ে দিতে চাইলে তা ‘হেবা’ (মুসলিম আইনে দান) বা সাধারণ ‘দান’ (Gift) দলিলের মাধ্যমে করতে পারেন।
আইনি নিয়ম: সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এবং রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী, জীবিত অবস্থায় স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে হলে অবশ্যই রেজিস্ট্রিকৃত দলিল করতে হবে। মুখে মুখে বা সাদা কাগজে লিখে দিলে তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। মুসলিম আইনে নিকটাত্মীয়দের (যেমন: সন্তান, স্ত্রী, মা-বাবা, ভাই-বোন) হেবা দলিল করার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি অত্যন্ত নামমাত্র।
ঝুঁকির জায়গা: একবার দলিল রেজিস্ট্রি করে সম্পত্তি হস্তান্তর করে দিলে, আপনি আইনগতভাবে সেই সম্পত্তির মালিকানা সম্পূর্ণ হারালেন। পরবর্তীতে সন্তান বা গ্রহীতা যদি আপনার ভরণপোষণ বা দেখভাল্ না করে, তবে আইনগতভাবে সেই সম্পত্তি সহজে ফেরত পাওয়া অত্যন্ত জটিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসম্ভব।
২. মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার (Succession)
আপনি জীবিত অবস্থায় কাউকে কোনো সম্পত্তি লিখে দিলেন না। আপনার মৃত্যুর পর আপনার রেখে যাওয়া স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আপনার ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন (যেমন: মুসলিম ফারায়েজ বা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন) অনুযায়ী সন্তানদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বণ্টন হবে।
আইনি নিয়ম: মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে প্রথমে তার কাফন-দাফনের খরচ, ধার-দেনা বা ঋণ এবং স্ত্রীর দেনমোহর (যদি বাকি থাকে) পরিশোধ করতে হবে। এরপর যদি কোনো বৈধ ‘অছিয়ত’ (Will) থাকে, তা মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ (এক-তৃতীয়াংশ) পর্যন্ত কার্যকর করা যাবে। এসব প্রক্রিয়া শেষে বাকি সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন হবে।
সুবিধা ও অসুবিধা: এর বড় সুবিধা হলো, জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই থাকছে, ফলে শেষ বয়সে অসহায় হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। তবে অসুবিধা হলো, আপনার মৃত্যুর পর শরিকদের মধ্যে বণ্টননামা দলিল বা আপোশ-বণ্টন নিয়ে বিরোধ বা মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হতে পারে।
একজন আইনজীবী হিসেবে বিশেষ পরামর্শ: অতি আবেগের বশে জীবিত অবস্থায় নিজের সব সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিঃস্ব করবেন না। যদি কোনো সন্তানকে বা কাউকে বিশেষ কারণে দিতেই হয়, তবে সম্পত্তির একটি অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুন, যেন আপনার শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।
বিকল্প হিসেবে আপনি চাইলে দলিলের মধ্যে শর্ত জুড়ে দিতে পারেন অথবা নির্দিষ্ট অংশ ‘অছিয়ত’ করে যেতে পারেন, যা আপনার মৃত্যুর পর কার্যকর হবে। আইন আপনাকে নিজের সুরক্ষার সব পথ দিয়েছে, শুধু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হবে।